রবিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২১

ছোটো গল্প হিসেবে রবীন্দ্রনাথের “ একরাত্রি ” কতটা সার্থকতা লাভ করতে পেরেছে ? আলোচনা করা প্রশ্নোত্তর

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours ছোটো গল্প হিসেবে রবীন্দ্রনাথের একরাত্রি  কতটা সার্থকতা লাভ করতে পেরেছে আলোচনা করা প্রশ্নোত্তর choto golpo hisebe robindronather akratri kotota sarthokota lav korte pereche alochona koro questions answer

উত্তর:- রবীন্দ্রনাথের একটি বিশিষ্ট ছোট গল্প “ একরাত্রি ” গল্পটি সার্থক কিনা সে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে , ছোট গল্প কাকে বলে এবং সার্থক ছোটগল্প হতে গেলে কোন কোন বৈশিষ্ট্য গল্পে থাকা অবশ্যক । স্বরূপের দিক থেকে ছোটগল্প হল গীতি কবিতার দোসর । দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে থেকে কোন ঘটনা , পরিস্থিতি বা পরিবেশের প্রভাবে নরনারীর হৃদয়ে জেগে ওঠা আনন্দ বেদনা ভাব ও অনুভূতিগুলিকে গদ্য ভাষার মাধ্যমে স্বল্প পরিসরের মধ্যে আস্বাদনযোগ্য করে ফুটিয়ে তোলাই হল ছোটগল্পের লক্ষ্য । রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটগল্পের জন্মদাতা । স্বভাবে কবি বলেই তাঁর গল্পগুলি গীতিকবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক । হৃদয়ে উদ্ভুত  গভীর ভাবরাশি এবং অনুভূতির প্রকাশ তাঁর গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য । “ একরাত্রি ” গল্পে গল্পকথকের হৃদয়ের সেরকমই কিছু গভীর ভাবের অভিব্যাক্তি ঘটানো হয়েছে । পাঠক তাতে যথার্থই রসাস্বাদনে সমর্থ হন । এ জন্য গল্পটিকে সার্থক ছোটগল্প বলতে বাধা থাকে না ।


[      ] সুরবালা নামের একটি মেয়ের সাথে গল্প কথকের বাল্য প্রণয় ছিল । তাদের বিবাহের ব্যাপারে অভিভাবকদের আগ্রহ ছিল । কিন্তু গল্পকথক লেখাপড়া শিখতে কলকাতায় গিয়ে নেতাদের গরম গরম বক্তৃতার প্রভাবে গারিবালডি হবার স্বপ্ন দেখতে থাকায় আজীবন বিবাহ না করবার সিদ্ধান্ত নেন এবং পিতাকে জানিয়ে দেন “ বিদ্যাভাস সম্পূর্ণ সমাধা না করিয়া বিবাহ করিব না ” তখন সুরবালার অভিভাবকেরা অন্য পাত্রে সুরবালার বিবাহ সম্পন্ন করেন । গল্প কথকের তখন অন্য স্বপ্ন মগ্ন ছিল বলেই সুরবালার প্রয়োজন উপলব্ধি করতে পারেন নি । কিন্তু পিতার মৃত্যুর পরই যখন অর্থনৈতিক চাপে পড়ে বাস্তবের মাটিতে নেমে আসতে বাধ্য হলেন তখন উপলব্ধি করলেন , সুরবালা তাঁর কতটা । সুরবালার অভাবে জীবনটা তাঁর কতটা ভরসাহীন । 


[      ] অনেক চেষ্টায় গল্পকথক তুচ্ছ একটা স্কুলে সেকেন্ড মাস্টারের পদ পান । স্কুল বাড়িতেই তাঁকে থাকতে হতো । ঘটনাচক্রে এই স্কুলবাড়ির খুব কাছেই সুরবালার স্বামী রামলোচনের বাসা । সৌজন্যবশত ,  একদিন আলাপ করতেও গিয়েছিলেন , কিন্তু সুরবালার সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের কথা প্রকাশ করতে পারেননি । তার সঙ্গে আলাপ করতেও পারেননি । এত নিকটে সুরবালার সঙ্গে দুটো কথা বলতে না পারার বেদনা গল্প কথক কে অস্থির করে তুলেছে । যে মেয়েটি তাঁর একান্ত আপনজন হতে পারত , সাময়িক ভুলের জন্য সে আজ পরস্ত্রী । জীবনে এ ভুল শোধরাবার আর উপায় নেই । তাই কথক বলেন “  ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করিতে কাহারো মনে পড়ে না ; তাহার পরে বেঠিক সময়ে বেঠিক বাসনা লইয়া অস্থির হইয়া মরে ।”


[      ] সুরবালার সান্নিধ্যে যেতে না পারার , আলাপ করতে না পারার চিন্তাই গল্পকথকের  বাল্য প্রণয়নকে তীব্র করে তুলেছে । পিপাসা চরিতার্থ হবার উপায় না থাকলে বিরহ বেদনা কে অসাধারণ দক্ষতায় অল্প কথায় ব্যক্ত করেছেন ।


[      ] গল্পের শেষভাগে সুরবালার সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করবার জন্য , একবার তাকে দেখবার জন্য গল্প কথকের মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে । তাকে বিবাহ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে তিনি যে অন্যায় করেছেন তার জন্য অনুতাপদগ্ধ  হৃদয়টাকে মেলে ধরতে চেয়েছেন । প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর রমলোচনের অনুপস্থিতি সেই সুযোগ তৈরি করে দিল । একদিন রাত্রি দেড়টার সময় বান এসে সব জল মগ্ন হতে থাকে । একাকী , অসহায় সুরবালাকে রক্ষা করতে দ্বিধা সংকোচ সরিয়ে রেখে গল্প কথক ছুটে যান । সুরবালাও বাঁচার তাগিদেই ওদিক থেকে পুষ্করিনীর উঁচু পাড়ে উঠে আসে । সেখানেই নিভৃতে দুজনের সাক্ষাৎ হয় । কিন্তু কেউ কারো কুশলও জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না । তাঁরা নিরবেই যেন নিজেদের মনের কথাগুলি পরস্পরকে জানিয়ে গেলেন । এই টুকুতেই গল্প কথক তৃপ্ত । 


[      ] গল্পটিতে কাহিনীর প্রাধান্য নেই ঘটনার বাহুল্যও নেই । আছে গল্পকথকের অন্তরে জেগে ওঠা কিছু ভাব ও অনুভূতির প্রকাশ । সামাজিক সংস্কারগত বাঁধার জন্য বাল্য প্রণয়নির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না পারার বেদনা পাঠকের মনে দাগ কেটে যায় । দুর্যোগের রাত্রে কয়েক মিনিটের জন্য কাছে পাওয়ার যে সার্থকতা কথা কথা বলা হয়েছে , তাও বেদনারই নামান্তর । সাহিত্য যা বেদনার , তা আস্বাদনের বিষয় । “ একরাত্রি ” গল্পের বিষয়ও খুবই উপভোগ্য হয়েছে । গল্পটা পড়ার পর পাঠকের মনের মধ্যে অনেকক্ষণ একটা রেশ থাকে । মন হয় যেন ,  “ “ শেষ হয়ে হইল না শেষ ।” তাই সবদিক থেকেই একরাত্রি একটি সার্থক ছোটগল্প ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন