শুক্রবার, ১২ নভেম্বর, ২০২১

অতিথি গল্পের চারুলতা ও সোনামনি চরিত্রের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো এবং অভিনব বিশেষ চরিত্র সৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্বের পরিচয় দাও প্রশ্নোত্তর

 

otithi golper charulota o sonamoni choritrer modhe tulonamulok alochona koro abong ovinob bisesh choritro srishtite robindronather krititto porichoy dao questions answer

উত্তর:- রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গল্প “ অতিথি ”র দুটি অভিনব কিশোরী চরিত্র চারুলতা এবং সোনামণি । স্বল্প পরিসরের মধ্যেই চরিত্র দুটির অন্তজগতকে রবীন্দ্রনাথ যে ভাবে স্পষ্ট করে তুলেছেন , তাতে তাঁর কৃতিত্ব স্বীকার করতেই হয় । চারুর ঈর্ষা মিশ্রিত ভালোবাসা যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন , তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না ।




[       ] চারুলতা জমিদার মতিলালাবাবুর একমাত্র কন্যা । বড়লোক বাবা মার একমাত্র কন্যা বলেই সে আদরে বড় হয়েছে । বাবা মায়ের আদরের একমাত্র অধিকারিণী সে । সে যখন প্রত্যক্ষ করে , কোথাকার কে , তারাপদ , একটা পথের ছেলে , সে তার বাবা মার স্নেহ ভালবাসায় ভাগ বসাচ্ছে , তখন স্বভাবতই সে তারাপদর প্রতি ঈর্ষা পরায়ন হয়ে উঠেছে , সে জেদি এবং খেয়ালী । খাওয়া , পরা , চুলবাধা , সমস্ত ব্যাপারে নিজের মতটাকেই প্রতিষ্ঠিত করত । সেটা না হলে সে সকলকে অতিষ্ঠ করে তুলত । তারাপদর প্রতি বাবা মাকে মনোযোগী হতে দেখে চারু বিরক্ত হয় তারাপদর উপরেই । কিন্তু তারাপদকে কোনোভাবে পীড়িত করতে না পেরে সে ভেতরে ভেতরে নিজেই পীড়িত হয় ।  এবং সকলকে অস্থির করে তোলে । সহজ ,সরল , উদার কিশোর বুঝতে পারে না চারু কে । তাই চারুর বিষয়ে তারাপদ কোনো কৌতুহলও প্রকাশ করে না । তার প্রতি তারাপদর এই ঔদাসীন্য  তার পিরা আর অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয় । মা অন্নপূর্ণা বুঝতে পারেন ।  চারুর ঈর্ষার কারণে এমনটা করছে । তাই চারুর সাক্ষাতে তারাপদর প্রতি তিনি স্নেহ প্রকাশও করেন না । অন্নপূর্ণার অনুরোধে তারাপদ সন্ধার সময় নদীর উপর গান গাইলে সকলেই মুগ্ধ হত , কিন্তু বিরক্ত চারু বিছানা থেকে উঠে এসে বলতো , “ মা তোমরা কি গোল করছ  , আমার ঘুম হচ্ছে না ।” তারাপদর কিছুই চারুর ভালো লাগত না ;  কেবল স্নানের সময় নদীতে তারাপদর সাঁতার কাটটা দেখতে চারুর ভালো লাগতো । কিন্তু সেই ভালোলাগাটাও সে ব্যক্ত করতে চাইত না ।




[      ] সোনামণি চারুলতার বিপরীত স্বভাবের মেয়ে । সে হতভাগিনী , তার বাপের ধনসম্পদ নেই , পাঁচ বছর বয়সে বিধবা হয়ে মায়ের কাছে রয়েছে । চারুর সে সমবয়সী । সখী । ভীরু , লাজুক , এবং কুণ্ঠিত । কিন্তু তারাপদ এই মেয়েটাকে নিজের গুনে আপন করে নিয়েছে । কাঠালিয়া গ্রামে এসেই সে গ্রাম ঘুরতে বেরিয়ে সোনামণিদের বাড়িতে গিয়েছিল । সোনামনির মাকে সে মাসি বলেছে , তাই সোনামণি তাকে দাদা বলেছে । তারাপদর সঙ্গে সোনামনির এই ভাইবোনের সম্পর্কটাও চারুর কাছে অসহ্য লাগে । তার সর্ব শরীর জ্বলে যায় । তুচ্ছ কারণে সোনামণির সঙ্গে চারুর “ আঁড়ি ” হয়ে যায় । তারাপদ যে সোনামনির কাছে সহজগম্য হয়ে উঠেছে , এটা চারু মেনে নিতে পারেনি । সে তারা পদ কে নিজের অধিকারের বস্তু মনে করতে চায় । অথচ সে আর একজনের “ দাদা ” হয়ে গেছে তার অজান্তে । একি মেনে নেওয়া যায় ?  সোনামণিকে তারাপদ একটা বাঁশিও নাকি বানিয়ে দিয়েছে । তাই গায়ের জ্বালা জুড়তে  তারাপদর বাঁশীটাকেই ভেঙে দিয়েছে ।




[      ] তারাপদ ইংরেজি শিক্ষা শুরু করলে , পড়ার ঘরে সময় কাটাতে থাকলে , চারু তারাপদর সঙ্গে ঝগড়া বিতর্ক করবার এবং তাকে চোখে চোখে রাখবে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় । তাই জেদ করে , “ আমিও  ইংরেজি শিখিব ।”  মাতা পিতা সম্মত হলেন এবং চারু তারাপদর সঙ্গেই অধ্যয়নে নিযুক্ত হল । পড়ার থেকে তারাপদর বিঘ্ন সৃষ্টি করাই তাঁর কাজ হল । তার দৌরাত্ম্য অসহ্য হলে তারাপদ তাকে প্রহারও করত । কিন্তু চারু শাসিত হতো না । বিরক্ত ও নিরুপায় তারাপদ মৌনব্রত অবলম্বন করে । তখন তাকে কথা বলাবার জন্য চারুর চেষ্টা চলতে থাকে । একসময় সোনামণি তারাপদর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেও ঘরে প্রবেশ করতে পারে না । উঁকি দেয় দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে । তার সঙ্গে তারাপদ কথা বললে চারু রেগে যায় বলে সোনামনির বড়ো সংকোচ । তারাপদ তাকে দেখতে পেলেই সস্নেহে কথা বলত , প্রায়ই বিকেলে তাদের বাড়িতে যেত । এটা আটকানোর জন্য চারু তারাপদর পড়ার ঘরে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয় । এতে বিরক্ত তারাপদ অভিমান করে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করলে চারু স্বীকার  , “  তোমার দুটি পায়ে পড়ি , আর আমি এমন করব না ।” তাতেও তারাপদ বশ না মানলে চারু কাঁদতে লাগে । তখন তারাপদ খেতে বসে ।




[     ] এভাবেই বিরোধিতা ও শত্রুতা সাধনের মধ্যে দিয়ে তারাপদর প্রতি চারুর কৈশোর প্রেম জাগ্রত হয় । তারাপদর মনেও কেমন এক রোমান্টিক অনুভুতি জাগতে থাকে , দিবা স্বপ্ন দেখার প্রবণতা জাগতে থাকে । মতিলালবাবু ও অন্নপূর্ণা সিদ্ধান্ত নেন ,  তারাপদর সঙ্গে চারুর বিবাহ দিয়ে তারাপদ কে যথার্থই নিজের করে নেবেন । এই সিদ্ধান্তের কথা গোপন রাখা হলেও চারু নিশ্চয় এক সময় জেনেছে । কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া লেখক আমাদের জানাননি । বনের পাখি তারাপদ খাঁচার পাখির আহ্বানে খাঁচায় ধরা পড়বার আশঙ্কায় যখন খাঁচা ছেড়ে চিরদিনের মতো উড়ে গেল , তখন চারুর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল , সোনামনির কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল , আমরা জানিনা ; কিন্তু অনুমান করতে পারি , সেই বিচ্ছেদ কারো কাছেই তৃপ্তি দায়ক ছিল না ; ছিল মর্মান্তিক বেদনার । সেই বেদনার স্রোতে ভাসবার সময় হয়তো চারুলতা ও সোনামণি পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে ছিল , কিন্তু আমাদের আর তা জানা হয়নি ।




[       ] ছোটগল্পের পরিনতি সবসময় স্পষ্ট হয়না । “ সাঙ্গ করি মনে হয় শেষ হয়ে হইল না শেষ ।” তারাপদ কোথায় গেল , তাকে হারিয়ে চারুর কি হল ,  সোনামনির কি হল ,  অন্যদেরই বা কি প্রতিক্রিয়া হল তা জানা যায় না । তবে তারাপদ কে হারিয়ে চারু আর সোনা উভয়েই সে শোকাত হয়েছিল , সেই শোক যে দুজনকে আবার পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল , তা অনুমান করা যেতেই পারে । গল্পের প্রধান চরিত্র যে তারাপদ , তাতে সংশয় নেই । তারাপদ চরিত্রকে পরিস্ফুট করার জন্য আর গল্পের রসকে বৈচিত্র্য ভরাবার জন্য চারু আর সোনামণির চরিত্র সৃষ্টি করা হয়েছে । লেখকের সহানুভূতির জন্য চরিত্র দুটি আমাদেরও সহানুভূতি ও ভালোবাসা দাবী করে । সৃষ্টি হিসেবে অবশ্যই মনে দাগ কাটে ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন