বুধবার, ১০ নভেম্বর, ২০২১

রবীন্দ্রনাথের “ নিশীথে ” গল্পটি আসলে দক্ষিণাচরণ নামের পুরুষ চরিত্রটির মনোবিকারের । পরিচয় আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours রবীন্দ্রনাথের নিশীথে গল্পটি আসলে দক্ষিণাচরণ নামের পুরুষ চরিত্রটির মনোবিকারের পরিচয় আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর robindronather nishithe golpoti asole dokkhinachoron namer purush choritrotir monobikarer porichoy alochona koro questions answer

উত্তর:-  রবীন্দ্রনাথের “ নিশীথে ” গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি হল দক্ষিণাচরণ । শিক্ষিত ,ভদ্র , ভাগ্য বিড়ম্বিত এই চরিত্রটির মানসিক বিকার জনিত দুর্ভোগ ফুটিয়ে তোলাটাই এ গল্পের লক্ষ্যে । গল্পের কাহিনী দক্ষিণাবাবুর জবানীতেই  পরিবেশিত হয়েছে । লেখক এক ডাক্তারের ভূমিকা নিয়ে সেই কাহিনী শুনেছেন ; কীভাবে দক্ষিণাচরণ  ভাগ্য কতৃক বিড়ম্বিত হয়েছেন , তা বুঝেছেন , বুঝেছি আমরাও ।




[       ] দক্ষিণাচরণ গল্পের নায়ক । তাঁকে আশ্রয় করেই গল্পের প্লট পরিকল্পণা । তিনি রাত দুপুরে ছুটে এসেছেন ডাক্তারের কাছে , মনের এক অতি প্রাকৃত ভয় ঘোচাবার পরামর্শ চাইতে । ডাক্তার এ ধরনের ভয়ের পিছনে ভ্রান্তি বা মদ্যপানের প্রভাব আছে বলে জানালে দক্ষিণাচরণ ভয়ের গুরুত্বটা বোঝাবার জন্য পূর্ববৃত্তান্তস্বরুপ আখ্যানটি শুনিয়েছেন । সেই আখ্যানটাই “ নিশীথে ” গল্পের মূল বিষয় ।




[      ] দক্ষিণাচরনের দাম্পত্য জীবন সুখেরই ছিল । প্রথম পক্ষের  স্ত্রী ছিলেন খুবই সতীসাধ্বী স্বামীর কল্যাণ এবং সুখ ছাড়া তাঁর আর কিছুই কাম্য ছিল না । নিজের জন্য তিনি কখনো কিছুই চাইতেন না । দক্ষিণাচরণ যখন কঠিন ব্যধিতে আক্রান্ত হন , তখন দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমে সেবা-শুশ্রূষা করে তাকে যমের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনেন । অথচ , নিজের অসুস্থতার সময় স্বামী একটু সেবা করতে উদ্যত হলেই অস্বস্তিতে ভোগেন ।




[       ] এই প্রথম পক্ষের স্ত্রীর অসুস্থতা এতটাই কঠিন হয়ে উঠল যে , কোনো চিকিৎসাতেই সারবার লক্ষণ দেখা গেল না । ডাক্তারের পরামর্শে তাকে বায়ু পরিবর্তনের জন্য এলাহাবাদে নিয়ে যাওয়া হল । সেখানে হারান ডাক্তারের চিকিৎসাতেও স্ত্রীর আরোগ্যের কোনো লক্ষণ দেখতে পেলেন না । স্বভাবতই দক্ষিণাচরনের মধ্যে এক হতাশার জন্ম হতে  থাকে । জীবনের চারিদিকে মরুভূমি দেখতে থাকেন । স্ত্রীকে তিনি ভালবাসেন , এমন সতীসাধ্বী স্ত্রীকে হারাবার কথা তিনি ভাবতে পারেন না । তাই বলে একে নিয়ে সারা জীবন কাটাতে হবে । এটা কি করে সম্ভব হবে , মনের এই ভাবনাটা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে তিনি স্ত্রীকে বেশি করে ভালোবাসতে চান । তাঁকে বলেন , “ তোমার ভালোবাসা আমি কোনোকালে ভুলিব না ।”




[       ] কথাটা বলবার তেমন প্রয়োজন ছিল না , তবুও বলায় স্ত্রীর মনে খটকা লাগার কথা । এলাহাবাদ গিয়েও যখন শরীর সারবার লক্ষণ দেখা গেল না , তখন স্ত্রী দক্ষিণাচরণ পরামর্শ দিলেন , “ তুমি আর একটা বিবাহ করার ।” দক্ষিণাচরণ একথায় হাসলেন চেষ্টা করেই হাসলেন । কারণ , মনে যায় থাক , স্ত্রীর কাছে বিবাহের কথায় খুশি প্রকাশ করা উচিত হয় না । তাই বলতে চাইলেন , “ যতদিন এই দেহে জীবন আছে ....” অর্থাৎ জীবনে তিনি আর বিবাহ করবেন না । কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণও হলো না , কথাটা রাখবার জন্য দক্ষিণাচরণের  আন্তরিকতা দেখাও গেল না । হারান ডাক্তারের বিবাহ বয়স উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষিত মেয়ে মনোরমার সঙ্গে আলাপ হতেই তার মনে বাসনা জাগতে শুরু করে , হারান ডাক্তারের বাড়িতে ঘনঘন যাতায়াত শুরু করেন । নিজেই বলেন “  মরুভূমির মধ্যে আর একবার মরীচিকা দেখিতে লাগিলাম । তৃষ্ণা যখন বুক পর্যন্ত তখন চোখের সামনে কূল পরিপূর্ণ স্বচ্ছ জল ছলছল ঢলঢল করিতে লাগিল । তখন মনকে প্রানপনে টানিয়া আর ফিরাইতে পারিলাম না ।”




[       ] দক্ষিণাবাবুর মনের অবস্থা তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রী নিশ্চয়ই কিছু আন্দাজ করেছিলেন । তাঁর জন্যই তার স্বামীর মনে সুখ নেই , এটা বুঝলে কোন সতীসাধ্বী স্ত্রী বেঁচে থাকতে চাইবেন । দক্ষিনাবাবু শুনলেন , তাঁর স্ত্রী হারান ডাক্তারের কাছে মৃত্যুর জন্য ওষুধ চাচ্ছেন । তার কাছে বসলেও স্বামীকে তিনি ক্ষুধা সঞ্চারের কারণে পীড়াপীড়ি করছেন । দক্ষিণাচরণ স্ত্রীর মনের কথা বোঝেন নি । মনোরমার আকর্ষন তাঁর কাছে এত তীব্র হয়ে উঠেছে যে প্রথমা স্ত্রীকে সময় দিতে পারেননি । তিনি মালিশ খেয়ে হয়েছেন । হয়তো সেজন্যই বিষাক্ত মালিককে তিনি আত্মহত্যা করে স্বামীকে মুক্তি দিয়ে গিয়েছেন ।




[      ] মুক্তি পেয়ে দক্ষিণাচরণ মনোরমাকে বিবাহ করেছেন এবং তাকে সঙ্গে নিয়েই দেশে ফিরেছেন । কিন্তু দেশে নানা কিছুর মধ্যে প্রথমা স্ত্রীর স্মৃতি জড়িয়ে থাকায় , বারবার তাঁর কথা মনে পড়ে যাওয়ায় মনোরমার প্রতি অমনোযোগ প্রকাশ পায় । মনোরমা অসন্তুষ্ট হন । বুঝতে পেরে তাকে তুষ্ট করবার জন্য বলেন “ মনোরোমা , তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না , কিন্তু তোমাকে আমি ভালোবাসি । তোমাকে কোনোকালে ভুলিতে পারিব না ।” কথাটা বলতে গিয়েই দক্ষিণাবাবুর মনে পড়ে যায় , প্রথমা স্ত্রীকেও তিনি এই কথা বলেছিলেন । জীবনে আর বিবাহ করবেন না বলেছিলেন । কথা রাখেন নি । তিনি প্রতারক , মিথ্যাবাদী । তাঁর জন্যই প্রথমা স্ত্রী মারা গেছেন । তাঁর মৃত আত্মা নিশ্চয় দক্ষিনার প্রতি সন্তুষ্ট নন । ভালোবাসার কথা শুনে সেই স্ত্রী মিষ্টি হাসি হেসেছিলেন । আজ সেই কথা শুনে তাঁর আত্মা নিশ্চয় কোথাও হেসে উঠেছেন । 




[        ] এই সব ভাবনা থেকেই দক্ষিণাচরনের মধ্যে জন্ম নিয়েছে মানসিক বিকার । তিনি আঁধার রাতে প্রায়ই প্রথমা স্ত্রীর উপস্থিতি অনুভব করেন , তাঁর হাসি শুনতে পান “ ও কে ?ওকে ? ওকে গো ?” বাস্তবে হয়তো তা অন্য কোন শব্দ ; কিন্তু দক্ষিনার কাছে তা মৃত স্ত্রীর হাসি এবং কথাই মনে হয় । তাই , তাঁর মনে জাগে ভয় । সেই ভয় কিছুতেই কাটতে চায় না । মানসিক বিকার জনিত এই ভয়ের তাড়নাতেই দক্ষিণাচরণ ছুটে আসেন ডাক্তারের কাছে । তিনি হয়ে উঠেছেন এক ভয় কাতর চরিত্র ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন