শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২১

“ দশরথের প্রতি কৈকেয়ী ” পত্রটি বিশ্লেষণ করা প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours দশরথের প্রতি কৈকেয়ী পত্রটি বিশ্লেষণ করা  প্রশ্নোত্তর Doshorother proti koikeyi potro ti bishleshon koro questions answer

উত্তর:- “ দশরথের প্রতি কেকেয়ী ” পত্রে রামায়ণের সর্ব নিন্দিত নারী কৈকেয়ীকে আমরা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বোধের উদ্দীপ্ত হতে দেখি । চারিত্রিক গুণাবলির বিচারে কৈকেয়ী অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন , তথাপি তার প্রতি কবি  মধুসূদনের সহানুভূতি ছিল আন্তরিক । তিনি পুত্রস্নেহে অন্ধ ,  স্বার্থপরায়না ও প্রতিহিংসা কাতর , তথাপি তাঁর ব্যক্তিত্ব অনস্বীকার্য ।

[        ] দশরথ তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র রামচন্দ্রে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত  করেন । যখন রাজ্যভিষেকের বিশাল আয়োজন চলতে থাকে , সমস্ত রাজপুরী যখন উৎসবে মাতোয়ারা ও মগ্ন তখন দাসী মন্থরা কুপরামর্শ দেয় রাণী কৈকেয়ী কে । তার প্ররোচনায় রাণী কৈকেয়ী রাজার পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভয়ংকর দুটি বর চেয়ে বসেন । সেই বর দুটি হল 


    ১. রামের চোদ্দ বছরের বনবাস ।


    ২.ভরতের রাজ্যভিষেক ।

দশরথের সমস্ত কাকুতি মিনতি ব্যর্থ হয় । কৈকেয়ী জানিয়ে দেন বর দুটি না পেলে তিনি আত্মহত্যা করবেন ।  কিন্তু মধুসূদন “ দশরথের প্রতি কৈকেয়ী ”  পত্রকাব্যে দুটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন ।


   ১. বৃদ্ধ রাজা দশরথের শৈস্ত্রনতা ।


২.  রাজার সত্যভঙ্গ করার অভিমান বুকে নিয়ে কৈকেয়ী আত্মহত্যা করার প্রতিজ্ঞা । আত্মহত্যার পূর্বেই বিশ্বজনকে তিনি জানিয়ে যেতে চান রঘুকুলপতি দশরথের ধর্মভ্রষ্টতার কথা । কেননা প্রাচীণ রঘুকূলের বিপুল গৌরবের মূলে ছিল সত্যরক্ষার ঐকান্তিক প্রয়াস । কুলমান নয় , কৈকেয়ীর কাছে এখানে বড়ো হয়ে উঠেছে তাঁর ভয়ঙ্কর ক্ষোভ । মধুসূদন রামায়ণের চরিত্র কৈকেয়ীকে নিয়ে এক চমৎকার শিল্প সৌন্দর্য নির্মাণ করেছেন এই পত্রিকায় ।

কৈকেয়ী দশরথকে তীব্র বিদ্রুপ করে বলেছেন যে তিনি পরম অর্ধম্মাচারী । অনেকের মতে এটি অনুযোগ পত্রিকা কিন্তু এখানে আমরা কেন অনুযোগকারিনি নয় , কৈকেয়ীকে এক বিদ্রোহীনি নারী রূপে দেখতে পায় । কৈকেয়ী চরিত্রটি ব্যক্তিত্বের অহমিকায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে , মর্ম পীরিতা নারীর অন্তরের অভিমান প্রতি পংক্তি তে ফুটে উঠেছে । এখানে এক প্রগতিশীলা নারীর আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সচেতনতা পরিলক্ষিত হয় । এদিক থেকে কৈকেয়ী চরিত্রটি অভিনবত্ব লাভ করেছে ।


দাসী মন্থরার মুখে কৌশল্যার পুত্র রামের রাজ্যভিষেক হচ্ছে শুনে কৈকেয়ী ব্যাঙ্গাত্মক প্রশ্নবাণে দশরথ কে জর্জরিত করে তুলেছেন তিনি হঠাৎ উৎসবে কারণ জানতে চেয়েছেন । রানী কৈকেয়ী জিজ্ঞাসা করেন যে , রাজা দশরথ কোনো শত্রুবিনাশ করার জন্য কি অকালে এই যজ্ঞ শুরু করেছেন , নাকি রাজার কোনো পুত্র জন্ম গ্রহণ করেছে । কিংবা কন্যার বিবাহ স্থির হয়েছে । অথবা বৃদ্ধা রাজা কি এই বয়সে কোনো রসবতী নারীর  মধুর সহচর্য লাভ করেছেন

                পাইলা কী পুন: এবয়সে  

                রসবতী নারী ধনে , কহ রাজ ঋষি ।


এভাবে কৈকেয়ী তার অন্তরের বেদনাকে তীব্র তীক্ষ্ণ ব্যাঙের দ্বারা উৎসারিত করে দিয়েছেন । দশরথ নিজ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে রাম কে সিংহাসনে বসাচ্ছেন , বঞ্চিত হচ্ছে তাঁর পুত্র ভরত । পুত্রের দাবী ভূলুণ্ঠিত , এতে কৈকেয়ীর অনুযোগ স্বাভাবিক । কিন্তু সেই সঙ্গে সত্যভ্রষ্ট ধর্ম চ্যত দশরথ কে ধর্ম মহিষী হিসেবে তিনি ধর্ম পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব বোধ উদবুদ্ধ হয়েছেন । অপ্রিয় সত্য বাক্য বলেছেন তিনি 


     “ অসত্যবাদী রঘুকুল পতি !

      নিলজ্জ ! প্রতিজ্ঞা তিনি ভাঙেন সহজে ।

      ধর্মশব্দ মুখে , গতি অধর্মের পথে ।”

তীব্র অভিযোগ অনুযোগ ব্যাঙের জ্বালা ও প্রতিহিংসা পূর্ণ কটুক্তিতে এই কবিতা অগ্নি স্বাবী । তার চরিত্রে পুত্র স্নেহ সর্বাধিক পুত্রের স্বাথহানি ঘটায় কৈকেয়ী ন্যায় অন্যায় রুচিশীলতা বর্জন করে দশরথকে বারবার আঘাত হেনেছেন । রামচন্দ্রের গৌরবও তিনি স্বীকার করেননি ।


         কি বিশিষ্ট গুন 

         দেখে রামচন্দ্র দেব , ধর্ম নষ্ট করে 

         অভীষ্ট পূর্নিতে তার , রঘু শ্রেষ্ট তুমি । 

পূর্ব প্রতিশ্রুতি স্মরণ করে দেওয়া সত্ত্বেও দশরথের চৈতন্যদয় না ঘটলে কৈকেয়ী দেশ দেশান্তরে ঘুরে পথিক গৃহস্থ রাজা কাঙাল ,  তাপস যেখানে পাবেন তার কাছে বলে বেড়াবেন “ পরম অর্ধম্মাচারী রঘুকুল পতি ।” এমনকি শুকসারি পুষেও একথা শিখিয়ে দেবেন । পল্লী বালাদেরও একথা শোনাবেন । এভাবে সত্যভ্রষ্ট দশরথের কথা সর্বত্র ব্যক্ত করে তিনি পাপ পুরী ত্যাগ করে চিরতরে চলে যাবেন । ভরত কে পাঠিয়ে দেবেন মাতুলালয়ে ।


ক্ষুব্ধ রুক্ষ রুদ্র কৈকেয়ী পত্রটি যেন এক দুরন্ত বহিশিখা । কৈকেয়ী এক কঠিন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যময়ী হয়ে উঠেছে মধুসূদনের হাতে । দৃপ্ত রৌদ্ররসের জীবন্ত প্রতিমূর্তি কৈকেয়ী রূপটি তাতে কোনো সংশয় নেই ।



 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন