বুধবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২১

সুবোধ ঘোষ তাঁর “ ফসিল ” গল্পের মধ্য দিয়ে যে বক্তব্য ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তা আলোচনা করে ছোট গল্প হিসেবে এর সার্থকতা নিরূপণ করো ।

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours সুবোধ ঘোষ তাঁর ফসিল গল্পের মধ্য দিয়ে যে বক্তব্য ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তা আলোচনা করে ছোট গল্প হিসেবে এর সার্থকতা নিরূপণ করো প্রশ্নোত্তর

উত্তর:- সুবোধ ঘোষের একটি বিখ্যাত ছোটগল্প “ ফসিল ” ।  এই গল্পের মুখ্য উপস্থাপিত বিষয় হল আধুনিক সমাজের চার শ্রেণীর মানুষের সংঘাত তন্ত্রের প্রতিভূ । যতদিনে সামন্তরাজা বা জমিদার নিরস নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করতেন , ততদিন  রাজ্যে কোনো অশান্তি ছিল না । মহারাজার বিলাস ব্যসনে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি প্রজাদের উপর নির্বিবাদে , নির্দ্বিধায় শোষণ চালিয়ে গিয়েছেন , অবাধ্য প্রজাদের নির্মম ভাবে শাসন করেছেন , তবু প্রজারা কখনো উচ্চ বাক্য করেনি । রাজ সরকারের লাঠি খেয়েও রাজার দান করা চিড়ে গুর আর আশীর্বাদ নিতে প্রজাদের মর্যাদায় বাঁধেনি । এই রাজ সরকারের আর্থিক প্রয়োজনেই টেনে আনা হয় বণিক সম্প্রদায় কে । গল্পে আমরা দেখেছি , অঞ্জন গড়ের ভূমি গর্ভে অভ্র এবং আসবেস্টাসের অস্তিত্ব অঞ্জন গড়ের অনুবর পাথুরে জমি লক্ষ লক্ষ টাকায় ইজারা করিয়ে দিয়েছেন । অর্থাৎ টাকা লেনদেনের মধ্যে দিয়েই সামন্ত তন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ধনতন্ত্র । আর তারই পরিণতি স্বরূপ সৃষ্ট হয়েছে সংঘাত । 




[      ] সামন্ততন্ত্র আর ধনতন্ত্র কখনই এক সঙ্গে টিকে থাকতে পারে না । এদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য । সামন্ততন্ত্র যেমন কৃষিপ্রধান ধণতন্ত্র তেমনি শিল্প প্রধান । কৃষিতে যেমন শ্রমিক দরকার , শিল্পেও তাই।  অঞ্জন গড়ে খনি প্রতিষ্ঠা করে অভ্র অ্যাসবেস্টাস তোলা শুরু হতেই বণিকদের প্রয়োজন হয় কুলির । এলাকার নিম্নবিত্ত এবং বিত্তহীনদের বেশী পারিশ্রমিক ও সুযোগ সুবিধার লোভ দেখিয়ে কুলির কাজে আকৃষ্ট করা হয় । কুমি প্রজারা কৃষিকাজ ছেড়ে দলে দলে খনির ধাওড়ায় নাম লিখিয়ে কুলি হয়ে গেল । এতেই সমস্যা দেখা দিল রাজ সরকারের কৃষিকাজে । রাজার জমিতে , রাজার বাগানে রাজার পোলো গ্রাউন্ডে কাজ করবার আগ্রহ আর কারো থাকল না । মহারাজার কৃষিকর্ম বন্ধ হতে বসল । মি. মুখার্জী বুঝতে পেরেছিলেন , প্রজারা বেশী প্রাপ্তির আশায় খনিতে কুলির কাজ করতে গেলে মহারাজার ক্ষতি হবে । সেই ক্ষতি রোধ করবার উদ্দেশ্যই তিনি কুমী নেতা দুলাল মাহাতোর কাছে এবং সিন্ডিকেটের চেয়ারম্যান গিবসনের কাছে নিজে গিয়েছেন । কিন্তু , সুরাহা কিছু হয় নি ।




[      ] আসলে , বণিকরা কাজ পাবার জন্য কুলিদের নগদ মজুরি এবং কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতেন , সেটা দেওয়া রাজসরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না । তাই , মহারাজার পক্ষ থেকে কাজ করবার নির্দেশ এলে কূমী নেতা দুলাল মহারাজার কাছে নানা রকম আবদার করে বসে । তেমন আবদার করতে তাকে শিখিয়েছে গিবসন । একটি চিঠিতে দুলাল মহারাজা কে লিখেছে “.... এবছর ভুট্টা , যব , জনার যা ফলবে তাতে যেন সরকারি হাত না পড়ে । আইন সঙ্গত ভাবে সরকার কে যা দেয় , তা আমরা দেব ও রসিদ নেব ।” 




[        ] দুলাল রাজনৈতিক নেতার মতোই কুর্মীদের একত্র করে বক্তৃতা দিয়ে বুঝিয়েছে “ চীনে দেখ কে আমাদের দুশমন কে বা আমাদের দোস্ত । আর ভয় করলে চলবে না । পেট আর  ইজ্জত , এর উপর ছুরি চালাতে আসবে তাকে কোন মতেই ক্ষমা নয় ।” মহারাজা দুলালকে সমঝে দেবার জন্য দরবারে ডেকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন । দুলাল দরবারে এসে বিনয়ের অবতার হয়েও মহারাজার কাছ থেকে বিদায় নিয়েই দ্বিতীয় পত্রটি লিখেছে । তাতে জানিয়েছে “ যেহেতু আমরা নগদ মজুরি পাই , না পেলে আমাদের পেট চলে না , সেই হেতু আমরা খনির কাজ ছাড়তে অসমর্থ । ... আগামী মাসে আমাদের নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠা হবে । রাজ তহবিল থেকে এক হাজার টাকা মঞ্জুর করতে সরকারের হুকুম হয় ।... আগামী শীতের সময়ে বিনা টিকিটে জঙ্গলের ঝরি আর লকরি ব্যাবহার করার অনুমতি হয় ।

 



[        ] এই সকল আবদার মেনে নেওয়া তো দূরে থাক , পড়া মাত্রই রাজার সামন্ততান্ত্রিক মেজাজ বিগড়ে গিয়েছে ।  পুরুষানুক্রমে যারা মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে , তারা ন্যায্য প্রতিবাদও সইতে পারে না । অন্য কেউ সেই প্রতিবাদকে সমর্থন করলে তাকেও শত্রু ভাবতে শুরু করে । এই জন্যই যে বণিকরা লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে রাজ সরকারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল , তারাই পড়ে শত্রুতে পরিণত হলো । কথায় বলে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলু খাগড়ার প্রাণ যায় । এখানেও রাজ সরকার আর বণিকদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বে অশিক্ষিত , দরিদ্র , সাধারণ মানুষের জীবনে বিপদ নেমে এসেছে । যখন দুই শক্তিশালী পক্ষ পরস্পরকে দুর্বল করার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য তৎপর হয়েছে ,  তখন আকম্বিকভাবেই খনির ১৪নং পিট ধ্বসে যায় এবং ৯০ জন কুলি চাপা পড়ে মারা যায় । এই সংবাদ পেয়েই মহারাজা আনন্দ সংবাদ হিসেবে গ্রহণ করেছেন । খুশি প্রকাশ করেছেন কারণ শত্রু বণিকদের দুর্বল করতে এই ঘটনাটা অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করা যাবে । নিজেরই রাজ্যের এতগুলি প্রচার এই দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যুর জন্য রাজার মনে শোক জাগেনি । আবার পরে যখন জানা গিয়েছে মহারাজার ফৌজদার জঙ্গলে লোকরি কাটতে যাওয়া ২২ জন কুমী প্রজাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে , তখন মহারাজা শঙ্কিত হয়েছেন প্রজাদের মৃত্যুর কারণে নয় , শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হল বলে , বণিকরাও নিশ্চয় এই ২২ জন প্রজার মৃত্যুর দায় রাজ সরকারের উপর চাপিয়ে স্বার্থসিদ্ধ করতে চাইবে । 


[      ] কাজেই দেখা যাচ্ছে সামন্ততন্ত্র ও বণিক তন্ত্রের সংঘাতে সাধারণ মানুষ , তথা শ্রমিক বা কুলিদের সমৃদ্ধি নেই । স্বার্থপরেরা স্বার্থের কারণে যেমন লড়াই করে , তেমনি স্বার্থের কারণে সন্ধিও করে । দুটি ঘটনায় শতাধিক গরীব মানুষ মারা গেল । সেই মৃত্যুর দায় যাদের , ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ভয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঝামেলার ভয়ে তারা শত্রুতা ভুলে এক টেবিলে মিটিং এবং খানাপিনা করে মৃত্যুর ঘটনা দুটোকেই গোপন করার উদ্যোগ হল । সমস্ত লাশ রাতারাতি ১৪নং পিটে ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দেওয়া হল । যার মাধ্যমে দুর্ঘটনার কথা প্রশাসন ও  আদালতের কাছে প্রকাশ হতে পারত , সেই দুলাল মাহাতো কেও হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হল পিটের গর্তে ।

 



[      ] গল্পের কাহিনীর নায়ক বা দ্রষ্টা মি . মুখার্জী র থেকে আমরা বুঝেছি , এই অসহায় শ্রেণীর মানুষেরা সামন্ততন্ত্র বা ধণতন্ত্রের কাছে কত তুচ্ছ , কত সাধারণ । সামন্ত তান্ত্রিক , জমিদার , ধনতান্ত্রিক বণিক , চাকরীজিবি মধ্যবিত্ত আর শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন মানুষদের শ্রেণীর সংঘাতের ছবি এ গল্পে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । এ যেন আমাদের জাতীয় সংকটেরই প্রতিফলন । দরিদ্র মানুষের জীবন যন্ত্রণা যেন বড় লোকদের কাছে ভাববার মতো কোনো বিষয়ই নয় । স্বার্থের কারণে পশুর মতো বলি দিলেও আপত্তি করবার কেউ নেই । এই খানেই গল্পের ট্রাজিক আবেদন । আর এইখানে ছোটগল্প হিসেবে “ ফসিল ” গল্পটির সার্থকতা ।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন