শুক্রবার, ৫ নভেম্বর, ২০২১

জ্ঞানদাসের রোমান্টিকতা আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours জ্ঞানদাসের রোমান্টিকতা আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

উত্তর:- জ্ঞানদাসের কাব্যের একটি মূল ধর্ম রোমান্টিকতা , রহস্যময়তা যাঁর কাব্যের মূল সম্পদ ,  অন্যান্য বৈষ্ণব পদকর্তার কবি ধর্মের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য সহজেই অনুমানযোগ্য । জ্ঞানদাস জানতেন শিল্প নৈপুণ্যে কাকে বলে । জানতেন কীভাবে পাঠকের হৃদয়কে ভাবাকুল করে তোলা যায় । যেমন পূর্বরাগের একটি পদে তিনি লিখেছেন 


    “ আলো মুঞ্জি জানো না সই জানো না ।”


রাধা আকুলভাবে পরম হৃদয়ের সুরে প্রকাশ করেছেন তাঁর মর্মবেদনা । কৃষ্ণ কদম্বতলে দাঁড়িয়ে আছেন , রাধিকা বলছেন , তা জানলে ঐ স্থানে যেতাম না । শুধুমাত্র এইটুকু বলার জন্য কি এমন সুরময়বাণী ঝংকৃত হয়েছে ? না , এর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে রহস্যময় ব্যাকুলতা ।



[       ] রোমান্টিক মনোভাবের একটি স্বত:সিদ্ধ গতি বিষাদের দিকে । জ্ঞানদাসের কাব্যে প্রায়ই সেই একটি রোমান্টিক বিষাদের সুরকে বেজে উঠতে দেখা যায় । কবি উপলব্ধি করেন যে , যে আনন্দ বা উল্লাস কে পরম সত্য বলে গ্রহণ করা হচ্ছে তা অবিমিশ্রিত জ্ঞানন্দময়  নয় । বেদনার ম্লান ছায়া তাঁর মধ্যে নিহিত । এই উপলদ্ধি কবি জীবনে ঘটে , কিন্তু পরিমাণ ভেদ আছে । রোমান্টিক কবিদের ক্ষেত্রে এই হতাশা বা আর্তিটুকু প্রবল । প্রায় সকল শ্রেষ্ট পদকারের মধ্যে এই অনুভুতির প্রকাশ দেখা গেলেও জ্ঞানদাসকেই তাঁর উজ্জ্বল প্রকাশ 


      রুপলাগি আঁখি ঝুরে গুনে মন ভোর ।

      প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর ।।

      হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে ।

      পরাণ পুতলি লাগি থির নাহি বান্ধে ।।



এত গভীর রোমান্টিক ভাবানুভূতি বৈষ্ণব সাহিত্যে আর নেই । অতৃপ্ত বাসনার মর্মস্পর্শী হাহাকার মাত্র চার ছত্রের মধ্যে যেভাবে ধরা পড়েছে , তা তুলনারহিত ।



[       ] রোমান্টিকতার সঙ্গে স্বপ্নের একটা নিগুঢ় যোগ অনুভূত হয় । যা কিছু অনিদিষ্ট তাঁর প্রতি রোমান্টিক মনের আকর্ষন । স্বপ্নে বাস্তব বলে কিছু নেই , অথচ বাস্তবের ছায়াটি তাতে প্রবল , সুতরাং সব রোমান্টিক কবি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন । জ্ঞান দাসের স্বপ্নের প্রতি আকর্ষণ আছে । একটি স্বপ্ন দর্শনকে তিনি যে কাব্য রুপ দিয়েছেন বহু ব্যাখ্যাতেও তাঁর পরিপূর্ন সৌন্দর্য উদঘাটন করা সম্ভব নয় । 


মনের পরম কথা          তোমারে কহিয়ে হেথা 

               শুন শুন পরানের সই 

স্বপনে দেখিনু যে            শ্যামল বরণ দে 

        তাহা বিনু আর কারো নাই ।।


এমন এক আশর্য রুপচিত্র , এমন ভাষা সুর ছন্দের অনিবার্য মায়া বিস্তার শক্তি অন্য কবির মধ্যে একান্ত দুর্লভ । কোনও এক বর্ষাকালে শত কবিতা থাকতে জ্ঞান দাসের নিম্নোক্ত পদটি রবীন্দ্রনাথের কল্পনাকে উজ্জীবিত করে তুলেছিল 


রজনী শাঙন ঘন                 ঘন দেয়া গরজন 

             রিমি ঝিমি শবদে বরিষে 


পালঙ্কে শয়ান রঙে               বিগলিত চির অঙ্গে 

                     নিন্দ যাই মনের হরিষে ।।


সমালোচকের ভাষায় “ সেদিন রাধিকার ছবির পিছনে কবি চোখের কাছে কোন একটি মেয়ে ছিল ভালোবাসার কুঁড়ি ধরা তার মন , মুখচোরা সেই মেয়ে , চোখে কাজল পরা , ঘাট থেকে নীল শাড়ী নিঙারি চলা । সে মেয়ে আজ নেই , আছে শাঙন বন , আছে সেই স্বপ্ন , আজো সমানই ।”



[        ] রোমান্টিক রহস্যপ্রিয়তার মধ্যে মাধুর্য হল অন্যতম লক্ষণ । জ্ঞানদাসে সমস্ত বাংলা পদকে মূলত মধুর বলে নির্দেশ করা যেতে পারে । এই মাধুর্য গুন সাধারণ ভাবে তাঁর কাব্যের বর্ননা ভঙ্গি , সংযত প্রকাশ ভঙ্গি শব্দ ব্যাবহারের মধ্যে এবং স্থান বিশেষে পরিবেশ ও ঘটনা সংস্থান কৌশলের গুনে চমৎকার ভাবে ফুটেছে । এ প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে রাধার জননী রাধাকে প্রশ্ন করছেন প্রাণনন্দিনী রাধা , তুমি কোথায় গিয়েছিলেন ? তোমাকে আমি সর্বত্র খুঁজে ফিরছি , তোমার এমন অপরূপ বেশবাসা কোথায় কেমন করে নষ্ট হল । এর উত্তরে রাধা যা বলেন তা অপরূপ মাধুর্যমন্ডিত 


                      মাগো গেনু খেলাবার তরে ।

পথে লাগি পেয়ে                        এক গোয়ালিনি 

                   লৈয়া গেল মোরে ঘরে ।।

গোপ রাজরানী                         নন্দের গৃহিণী 

                   যশোদা তাহার নাম ।

তাহার বেটার                       রূপের ছযটায়

             জুরায়ল মোর প্রাণ ।। ইত্যাদি ।


এইভাবে বর্ননা ভঙ্গির মধ্য দিয়ে জ্ঞান দাসের কাব্য মাধুর্য গুন প্রকট হয়ে উঠেছে ।



[       ] সর্বোপরি বলতে হয় , রোমান্টিসিজমের একদিকে আছে প্রেমানুভূতি অন্যদিকে আছে , সর্ববস্তুস্তে নিজেকে বিকিরিত করার বাসনা এবং জড়ের মধ্যে প্রাণের অনুভব । এই সকল অংশকে আধ্যাত্মিক ভাব ব্যাকুলতার প্রকাশ বললে ভুল হবে । জ্ঞান দাস যে প্রেমের মূল মর্মবাণী রোমান্টিকতা । এই প্রেম বর্ণনার মধ্যেই জ্ঞান দাসের কবিত্ব সার্থকতা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন