শনিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২১

পোস্টমাস্টার গল্পটি ছোট গল্প হিসেবে কতটা সার্থকতা লাভ করেছে আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours পোস্টমাস্টার গল্পটি ছোট গল্প হিসেবে কতটা সার্থকতা লাভ করেছে আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর postmaster golpo ti choto golpo hisebe kotota sarthokota lav koreche questions answer

উত্তর:- রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের ছোট গল্প গুলির মধ্যে একটি অসাধারণ সার্থক ছোটগল্প “ পোস্টমাস্টার ” জমিদারি দেখা উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহে ছিলেন , তখন কুঠিবাড়ির এক পোস্টমাস্টারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল । তাঁর প্রায় নিঃসঙ্গ জীবন যাত্রা প্রত্যক্ষ করে কবির মনে যে ভাবনা জেগে উঠেছিল , তাকে প্রকাশ করতেই “পোস্টমাস্টার ” গল্পটি রচনা করেন নিজেই ইন্দিরাদেবীকে লেখা একটি পত্রে বলেছেন “ যখন আমাদের এই কুটিবাড়ির একতলাতেই পোস্ট অফিস ছিল এবং আমি একে প্রতিদিন দেখতে পেতুম তখনই আমি একদিন দুপুরবেলায় এই দোতলায় বসে সেই পোস্টমাস্টারের গল্পটি লিখেছিলাম ।”




[     ] আয়তনের দিক থেকে “ পোস্টমাস্টার ” গল্পটি খুবই ছোট । মাত্র চার পাঁচ পাতার । মাত্র  চরিত্রকে অবলম্বন করে মানুষের অসাধারণ কিছু অনুভূতির কিছু অবাঞ্চিত অথচ অনিবার্য দুঃখ-বেদনার সার্থক প্রকাশ ঘটেছে । কলকাতার ছেলে পোস্ট মাস্টারের চাকরি নিয়ে গ্রাম্য এলাকায় এসেছেন । এখনকার প্রতিকূল পরিবেশে তাঁর অবস্থা হয়েছে যেন ডাঙায় তোলা মাছ । অবসর কাটাবার তাঁর কোনো উপায় নেই । তাই কাজের মেয়ে রতনকে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টায় তিনি ব্রতী হন যেটুকু সময় কাটানো যায় ।




[       ] বারো তেরো বছরের মেয়ে রতন । অভিভাবক নেই বলে তার এখনো বিয়ে হয়নি । নিঃসঙ্গ পোস্টমাস্টার আর নিঃসঙ্গ রতন পরস্পরের সঙ্গী হয়ে উঠল । বাবা মা ভাই বোনদের প্রসঙ্গে আলোচনা করতে করতে উভয়ের মধ্যে একটা সহজ স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে । উভয়েই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে । “ অবশেষে এমন হইল । বালিকা কথোপকথনকালে তাঁহার ঘরের লোকদিগকে মা দিদি দাদা বলিয়া চিরপরিচিতের ন্যায় উল্লেখ করিত । এমনকি তাহার ক্ষুদ্র হৃদয় পটে তাহাদের কাল্পনিক মূর্তিও চিত্রিত করিয়া লইয়াছিল ।”





[      ] এই সম্পর্কটা আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল একটা ঘটনায় । পোস্টমাস্টার হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়লেন । একটুখানি সেবা পাবার জন্য পোস্টমাস্টারের যখন মায়ের কথা মনে পড়েছিল তখন এই গ্রাম্য অশিক্ষিত মেয়েটি সেবার সমস্ত দায়িত্ব অত্যন্ত আপন জনের মতো নিজের কাঁধে তুলে নিল । “ বালিকা রতন আর বালিকা রহিল না । সেই মুহূর্তেই সে জননীর পদ অধিকার করিয়া বসিল । বৈদ্য ডাকিয়া আনিল , যথাসময়ে বটিকা খাওয়াইল , শিয়রে সারা রাত্রি জাগিয়া রহিল , আপনি পত্য রাধিয়া দিল এবং শতবার করিয়া জিজ্ঞাসা করিল “ হ্যাঁগো দাদাবাবু ,একটুখানি ভালো বোধ হচ্ছে কী !” 



[     ] রতনের সেবা যত্নেই যে পোস্টমাস্টার সুস্থ হয়ে ওঠেন তাতে সন্দেহ নেই । দাদাবাবুর প্রতি রতনের যেন খানিকটা অধিকার জন্মে গেলো এভাবেই । কিন্তু পোস্টমাস্টার আর বিপজ্জনক গ্রাম্য পরিবেশে থাকতে চাইলেন না । তিনি বদলির দরখাস্ত পাঠালেন । দরখাস্ত না মঞ্জুর হলে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে প্রস্তুত হলেন । একেবারে অন্তিম লগ্নে রতনকে সে কথা জানালেন “ রতন , কালই আমি যাচ্ছি ।” রতন যখন বুঝেছে তার দাদাবাবু চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছেন , আর কখনো আসবেন না , তখন এতদিন ধরে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ভিত্তিতে জানতে চায় “ দাদাবাবু আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে ?” পোস্টমাস্টার হেসে দেন , “ সে কি করে হবে ।”



[     ] কেন যে হবে না , কলকাতার অবিবাহিত যুবকের পক্ষে পাড়াগাঁর একটা অজ্ঞাত কুলহীন , অবিবাহিত , সভ্যসমাজের উপযুক্ত শিক্ষা ও সংস্কৃতিহীন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সমস্যা যে কি , তা রতনের মতো সহজ সরল  গ্রাম্য বালিকার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় । তার বিবেচনায় এই প্রশ্নটাই বড়ো হয়ে ওঠে আপনার জন ভেবে যাঁকে সেবা করে সুস্থ করে তুলেছে তিনি তার জন্য এতটুকু ভাববেন না । দাদাবাবু এত নিষ্ঠুর , এত অকৃতজ্ঞ ।



[    ] রতনে বিষন্নতা প্রত্যক্ষ করে পোস্টমাস্টার ভেবেছিলেন ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও খাওয়া পরার কথা ভেবেই রতনের দুশ্চিন্তা । তাই আশ্বাস দিয়েছেন , পরবর্তী যে পোস্টমাস্টার আসছেন , তিনি যাতে রতনকে যত্ন করেন সে ব্যবস্থা করে যাবেন । পথ খরচা বাবদ কিছু রেখে বাকি টাকাগুলো তিনি রতনকে দিতে চেয়েছেন । কিন্তু অভিমানী রতন নিতে চায় নি । বলেছে , “ তোমার দুটি পায়ে পড়ি , আমার জন্য কাউকে কিছু ভাবতে হবে না ।”




[     ] এই অভিমানের স্বরূপ শিক্ষিত পোস্টমাস্টার একেবারেই যে বোঝেন নি তা নয় । গ্রাম্যবালিকার হৃদয়ের ছবিটি তিনি নিশ্চয় অনুমান করতে পেরেছেন , তাই তাঁর মনেও হয়েছে , “ ফিরিয়া যাই , জগতের ক্রোর বিচ্যুতি সেও অনাথিনিকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি ।” কিন্তু নানাবিধ প্রতিকুলতায় পোস্টমাস্টারের  মনের ইচ্ছা পূরণ হয়নি । তিনি তত্ত্ব কথাকে আশ্রয় করে সান্ত্বনা খুঁজতে চেয়েছেন , কিন্তু শূন্য হৃদয় রতনের সান্তনা লাভের কোনো উপায় হয় নি । সে এক অসম্ভব আশায় ভর করে দাদাবাবু যদি ফিরে আসেন , এই ভাবনাকে আশ্রয় করে পোস্টঅফিসের চারপাশে ঘুরে বেরিয়েছে ।



[      ] দুটি মাত্র চরিত্রের বিকাশ ও পরিণতির মধ্যে দিয়ে , ক্ষুদ্র পরিসরে । রবীন্দ্রনাথ মানব হৃদয়ের কিছু চিরন্তন অনুভূতিকে অসাধারণ দক্ষতায় জাগিয়ে তুলেছেন । একটি স্বজনহারা গ্রাম্যবালিকার স্নেহলোলুপ হৃদয়ের চিত্র এভাবে আর কোনো গল্পে ফুটে ওঠে নি । ছোটগল্পের সমস্ত বৈশিষ্ট্য এ গল্পে ফুটে উঠেছে । গীতিধর্মিতা , নাটকীয়তা , গতি , চরিত্রসৃষ্টি , স্রষ্টার জীবন দর্শন সবই জীবনদর্শন সবই গল্পটিতে রয়েছে । তাই পোস্টমাস্টার অবশ্যই  একটি সার্থক ছোটগল্প ।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন