সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

“ দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা ” পত্রিকায় শকুন্তলা চরিত্রটি কিভাবে বীরাঙ্গণা হয়েছে তা আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা পত্রিকায় শকুন্তলা চরিত্রটি কিভাবে বীরাঙ্গণা হয়েছে তা আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর dushmanter proti shokuntola potrikay shokuntola choritroti kivabe birangona hoyeche ta alochona koro questions answer

উত্তর:- প্রথম নায়িকা শকুন্তলার পত্র দিয়েই মধু বীরাঙ্গনা কাব্য সূচনা করেছেন । শকুন্তলার উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা স্বাভাবিক কারণেই দুষ্মন্ত মৃগয়া করতে একবারই প্রবেশ করেছিলেন মুনির আশ্রমে এবং শকুন্তলার কোমল মনের প্রেমের অর্ঘ্য গ্রহণ করে সেই যে চলে গিয়েছিল আর তাঁর দেখা নেই । নিষ্ঠুর ব্যাধের মতোই হৃদয়ের ওপর মৃগয়াবৃত্তি প্রকাশ করে তিনি সেই তপোবনে তপোবনচারিনী কে দেখে বিস্মিত হয়েছেন । এর পরের যে কাহিনি সকলেরই জানা আছে দুর্বাশা মুনির অভিশাপ । এই অভিশাপের কারণেই দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে বিস্মৃত হয়েছিলেন , পুরাণ কথা এঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় , কিন্তু মধুসূদন তাঁর নায়িকাকে সে প্রণয়ন স্মরণ করেছেন সময়কাল ও পূর্বের বলে বোঝা যায় । দুষ্মন্ত চলে যাবার পরে তার চিন্তায় শকুন্তলা বিহ্বল হয়ে পড়েছিল , সে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে একেবারেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল । তাই সমস্তক্ষণেই সে দুষ্মন্তের চিন্তায় বাহ্যজ্ঞান থাকত । এই ব্যাপারটি বোঝাবার জন্যই দুর্বাশার আগমন বৃত্তান্তটি মূল্যবান । তপোবন পরিচর্যাকারিনি হিসেবে শকুন্তলার সবচেয়ে অতিথি তপোবনে প্রবেশ করে আতিথ্য প্রাথনা করা সত্ত্বেও শকুন্তলা সে সময় অবহিত হতে পারেননি । মনের এই অবস্থাতেই সে দুষ্মন্তের পত্র রচনা করতে বসেছিল , এটাই কবিকল্পনা ।


[      ] সংস্কৃত সাহিত্যের বিখ্যাত কবি কালিদাস রচিত “ অভিজ্ঞান শকুন্তলম ” অবলম্বনে কবি শকুন্তলা চরিত্র নির্মাণ করেছেন । মহর্ষি কন্নের আশ্রমে উপনীত রাজা দুষ্মন্ত কন্নের আশ্রিতা তপোবন বালিকা শকুন্তলার সাক্ষাৎপ্রাপ্ত এবং গান্ধব মতে তাকে বিবাহ করেন । রাজ্য ফিরে যাবার সময় তিনি তাকে রাজকীয় মর্যাদায় বরণ করে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেন । কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও দুষ্মন্তের কোনো  সংবাদ না পেয়ে বিরহ বিক্ষুধ শকুন্তলা এই পত্র রচনা করেন । বিশ্বামিত্র ও মেনকা পরিতক্ত কন্যা এরকম কোনো পত্র রাজসমীপে প্রেরণ করেছিলে তা জানা যায় না । সম্ভবত এটি কবিকল্পনা । দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলার সুগভীর প্রথম পত্রে ব্যক্ত হয়েছে । শকুন্তলা প্রতি মুহূর্তে দুষ্মন্তের আগমনের জন্য প্রতীক্ষা করেছিলেন । তার আশা দুষ্মন্ত এসে তাকে নিয়ে যাবেন রাজপ্রাসাদে ,  কিন্তু দুষ্মন্তের দিক থেকে কোনো  আকর্ষণই কার্যত দেখা মেলে না । তপোবনে বিশ্ব প্রকৃতির নানা স্বাদ , পশুপাখির আনন্দ , মুখরতা , সবই তার কাছে নিরর্থক মনে হয় । বনদেবীর সঙ্গে শকুন্তলার ছিল নিবিড় অভিযোগ । তাই তার মনে হয় ‘ কাঁদিছেন বনদেবী দুঃখিনীর দুখে ।” আসলে সর্গের প্রতি ছত্রে শকুন্তলার মনোবেদনার প্রকাশ ঘটেছে । শৈশবে পিতা মাতা কতৃত পরিত্যক্ত হয়েছেন , যৌবনে স্বামী রূপে যাকে বরণ করলেন তিনি তাকে ভুলে গেলেন । গান্ধব মতে বিয়ে করে স্ত্রীকে একেবারে বিস্মৃত হওয়া যে জাতীয় অমানবিক আচরন তাতে স্ত্রী হিসেবে অনেক কঠোর বাক্য শকুন্তলা প্রয়োগ করতে পারতো । কিন্তু কবি একথা বিস্মৃত হননি যে সে আশ্রমকন্যা । সুতরাং তার ভাষা ব্যবহারও তার উপযোগী হওয়া বাঞ্চনীয় । তাই তার মানসিক অবস্থায় সে বেশি করে বুঝিয়ে বলবনার চেষ্টা করেছে , প্রতিমুহূর্তে রাজার প্রত্যাবর্তন আশা তাঁর মনে এতই প্রবল যে সে বলে 




      “ অমনি চমকি ভাবি , - মদকল ?

      বিবিধ রতন অঙ্গে পশিছে আশ্রমে ।”




এই ভুল অবশ্য ভাঙতেও বিলম্ব হয় না । দুই সখী শকুন্তলার দুঃখ দেখে কেবল কাঁদে । বনের পশু পাখি তরুলতাদের আগের মতোই আনন্দিত দেখে শকুন্তলার ক্রোধ হয় । এখানে মধুসূদন প্রাচীন দৃষ্টি ত্যাগ করে আধুনিক হয়ে উঠেছেন । শকুন্তলাকে তপোবন থেকে বিদায় দেবার সময় মনুষ্যতর প্রাণী এবং তরুলতাদি শোখবিহুল হয়ে উঠেছে । এটাই প্রাচীণ সৃষ্টি । মধুসূদনের দৃষ্টিতে বিরহীনি শকুন্তলা তাঁর বিরহ বিষন্ন মনে তপোবনের মনুষ্যতর প্রাণীর চিরাচরিতের আনন্দিত জীবন সহ্য করতে পারেন না । সে পুষ্পকুঞ্জে বলেছে -



        “ রে নিকুঞ্জ শোভা , 

          কী সাধে সহিস তোরা ? কেন সমীরণে 

          বিতরিস আজি হেথা পরিমল সুধা ?”


কোকিল কে ডেকে সে বলে 


          “ কেন তুমি , পিককুল পতি 

          এ স্বর লহরী , আজি বরিষ এ বনে ?

           কে করে আনন্দ ধ্বনি নিরানন্দ কালে ?”



শকুন্তলার কিছুই ভালো লাগে না । কেবল যেসব স্থান দুষ্মন্ত প্রতি সুরভিত যেসব স্থানে সে ঘুরে বেড়ায় । দুষ্মন্তের সঙ্গে প্রথম দর্শনের প্রথম প্রেমের কিছু বিচ্ছিন্ন চিত্র তাকে উন্মাদ করে তোলে । যে তরুতলে গান্ধব বিবাহ হয়েছিল যে নিকুঞ্জে ফুলশয্যা হয়েছিল সে স্থানে শকুন্তলার বিদগ্ধ হৃদয় নিয়ে ঘুরে বেড়ায় । শকুন্তলা তার দুই সখী কে দেখাতে চায় না কারণ 



 “ বিবশা দেখিলে মোরে রোষে ঋষি বালা ,

  নিন্দে তোমাহে নরেন্দ্র , মন্দ কথা কয়ে ।

  বজ্র সম অপবাদ বাজে পোড়া বুকে ।

  ফাটি অন্তরিত রাগে বাক্য নাহি ফোটে ।”



আসলে বিরহ দিন একটি রোমান্টিক নায়িকা রূপেই শকুন্তলাকে দেখেছেন পল্লবিনী লতার মতোই কোমলতার চরিত্র তাই নিজেই সে কষ্ট পেতে পারে । এই কথাই জানাবার জন্য পত্র লিখতে পারে ।



“ দাসী ভাবে পাদুখানি এই লোভ মনে ” কিন্তু তীক্ষ্ণ অনুযোগ বা অভিমান আশ্রমে বালিকাভাবে আর মনে বিষচরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে দাসীর ভাব । বন নিবাসী শকুন্তলা তো কিছুই চায়নি চেয়েছিল শুধু ভালোবাসা , একটু সহানুভূতি । সে তাও পেল না , কিন্তু মনে ক্ষীণ আশা তখনও অবশিষ্ট , দুষ্মন্ত একদিন নিশ্চিত ফিরবেন ।  তাই এই চিঠি epistle টিলিখে রাজার কাছে পাঠালেন শকুন্তলা । জীবনের আশা হয়ে কে  ত্যাজ সহজে ,  এই পংক্তিতে শকুন্তলার ভগ্ন আশা , তাঁর মর্মান্তিক দীর্ঘশ্বাস উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে ।



চিরন্তন কাব্যসুন্দরী শকুন্তলার বিরহিণী রূপ নারী হৃদয়ের উৎকণ্ঠা , স্বামীর প্রতি অনুযোগ ও অভিমান আলোচ্য পত্রিকায় অপূর্ব সুধাময়ে মন্ডিত হয়ে প্রকাশ বীরাঙ্গনাকে করেছে শ্রেষ্ঠ কাব্য ও মধুসূদন হয়েছেন শ্রেষ্ঠ কবি ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন