মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২১

ত্যাগ গল্পে কে কী ত্যাগ করেছে ? তাঁর আলোচনা প্রসঙ্গে এই গল্পের নামকরণ সার্থকতা বিচার করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours ত্যাগ গল্পে কে কী ত্যাগ করেছে ? তাঁর আলোচনা প্রসঙ্গে এই গল্পের নামকরণ সার্থকতা বিচার করো প্রশ্নোত্তর tag golpe ke ki tag koreche tar alochona prosongo ai golper namkoron sarthokota bichar koro

উত্তর:- রবীন্দ্রনাথের একটি বিশিষ্ট ছোটগল্প “ ত্যাগ ” এই গল্পের নায়ক হেমন্ত প্রিয়তমার ভালোবাসার মর্যাদা দিতে গিয়ে পিতৃগৃহ এবং জাত ত্যাগ করেছে । শুধু এই টুকুর জন্যই যে গল্পের “ ত্যাগ ” নাম সার্থক হয়েছে তা নয় এই নামকরণের আরো অনেক তাৎপর্য আছে ।



[      ] রবীন্দ্র সমকালে জাতপাত নিয়ে হিন্দু সমাজে বিশেষত , উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজে যথেষ্ট মাথাব্যথা ছিল । সমাজ পতিরা কথায় কথায় নিরাপরাধ মানুষকে এবং সামান্য অপরাধী মানুষকে জাতিচূত্ত করতেন । সমাজ পতিদের অহংকার , অবিচার , ঈর্ষা আর মানবিক গুণের অভাব কত নিরীহ মানুষের জীবনকে বিড়ম্বিত করেছে ।যন্ত্রণাময় করে তুলেছে । রবীন্দ্রনাথের মনেও তা ব্যথা-বেদনার কারণ হয়েছে । তাই গল্পটির মধ্য দিয়ে সেই অন্তঃসারশূন্য জাত পাতের কুফল দেখাতে চাইলেন ।



[      ] সমাজপতি হরিহর প্রতিবেশী প্যারিশংকরকে জাতিচূত্ত করেন তুচ্ছ কারণে । প্যারিসশংকরের জামাতা পাঁচ বছর বিলেতে থেকে ব্যারিস্টারী পড়ে এসেছে । এই বিলেত ফেরত জামাতার গৃহে কন্যা কে পাঠানোয় এবং সেই কন্যা কে ত্যাগ না করায় প্যারিসশংকর জাতিচূত্ত হন । জাতিরক্ষার কারণে একমাত্র কন্যাকে ত্যাগ করা বা কন্যাকে স্বামীর সান্নিধ্য বঞ্চিত করা কোনো বাবা মায়ের পক্ষেই সম্ভব নয় । প্যারিসশংকরের পক্ষেও সম্ভব হয়নি । তাই তিনি হরিহরের সমাজ ত্যাগ করে , কন্যা জামাতার কল্যাণে কলকাতায় চলে যান ।



[      ] এই প্যারিসশংকর প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্যেই হরিহর মুখুজ্জের ছেলে হেমন্তের সঙ্গে এক কায়স্থ বালবিধবার বিবাহ ঘটান ।  জোর করে অবশ্যই নয় কৌশলে । হেমন্ত কলেজে পড়বার জন্য কলকাতায় থাকবার সময় বংশ পরিচয় না জেনেই মেয়েটির প্রেমে পড়েছিল , মেয়েটিও । প্যারিসশংকর এই সম্পর্কের কথাটি জানতে পেরে প্রতিশোধ গ্রহনের আগ্রহে মেয়েটিকে শ্রীপতি চাটুজ্জের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়ে , সম্বন্ধ করে হেমন্তের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন করেন । তার পর প্রকৃত তথ্য প্রচার করে দিয়ে হরিহর মুখুজ্জেকে জাতিচূত্ত বলে ঘোষণা করেন ।



[     ] সমাজপতি হরিহর জাতিরক্ষার তাগিদেই পুত্র হেমন্তকে নির্দেশ দেন বউকে দূর করে দিতে । হেমন্ত প্যারিসশংকরের কাছে ছুটে গিয়ে যেমন জেনেছে তার স্ত্রী সত্যিই কায়স্থের বালবিধবা , বিপ্রদাস চাটুজ্জের আশ্রিতা , তেমনি এও জেনেছে , কুসুম তাকে প্রাণের থেকেও ভালোবাসে । সেই ভালবাসার কারণেই , প্যারিসশংকরের ছলনায় ভুলেই শুধুমাত্র হেমন্তের প্রাণরক্ষার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে অসমীচীন বিবাহে রাজী হয়েছে । অর্থাৎ এ বিবাহে কুসুমের কিছুমাত্র দোষ নেই । তাদের দীর্ঘদিনের প্রণয়ে কোনো খাদ ছিল না । প্রেমিকের হৃদয় নিয়েই হেমন্ত বিচার করেছে কুসুমকে । আর সেটা করতে গিয়েই প্রেমের কাছে , মানবিকতার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে জাতের গর্ব । হরিহরের কাছে জাত বড়ো । মানুষ বড়ো নয় । তাই , অসহায় পুত্র বধূকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলতে তাঁর বাঁধে না । মেয়েটি কোথায় যাবে , কীভাবে তাঁর কাটবে , তা নিয়ে তিনি ভাবেন না । ইতিপূর্বে প্যারিসশংকরের মেয়ের জীবন নিয়েও তিনি ভাবেননি । তাই জাত রক্ষার জন্য জামাতা কে বা কন্যাকে ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন ।




[      ] প্যারিশংকর কন্যা জামাতাকে ত্যাগ করতে পারেননি -  জাত ত্যাগ করে গিয়েছেন । হেমন্তকেও যখন তার পিতা নির্দেশ দিয়েছেন “ মেয়েটাকে ঘর হইতে দূর করিয়া দাও ।” তখন হেমন্তও পিতার নির্দেশ অমান্য করে বলেছে “ আমি স্ত্রীকে ত্যাগ করিব না ।” পিতা গর্জন করে ওঠেন , “ জাত খোয়াইবি ?” হেমন্ত জবাব দেয় , “ আমি জাত মানি না ।” হরিহর বলেন , “ তবে তুই শুদ্ধ দূর হইয়া যা ।”



[     ] হরিহর পুত্রবধূকে ত্যাগ করতে চেয়ে ছিলেন । অন্য দিকে হেমন্ত হৃদয়ধর্ম কে মর্যাদা দিতে গিয়ে , অসহায় , নিরপরাধ স্ত্রীকে রক্ষা করবার জন্য পিতাকে , পিতৃগৃহকে , জাতপাতের গর্ববোধকে ত্যাগ করেছে । গল্পের পরিনতির মধ্যে দিয়ে লেখক যেন বলতে চাচ্ছেন , সামাজিক মানুষের অকল্যাণ সৃষ্টি কারি জাত পাত বা কু প্রথাকে ত্যাগ করে মানুষের কল্যাণ সৃষ্টিকারী ভালোবাসা , উদারতা মানবতা , মহত্ব কে বরণ করতে হবে । এই সব রকম ত্যাগই গল্পটিতে স্থান পেয়েছে হয়েছে । জাত রক্ষার জন্য মানুষকে ত্যাগ না কি মানুষকে রক্ষার জন্য জাত ত্যাগ বড়ো কাজ এই চেতনাটাই পাঠকের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিতে চান । “ ত্যাগ ” নামকরণটিও এদিক থেকেই খুবই তাৎপর্যপূর্ন হয়ে উঠেছে ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন