রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২১

বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে প্যারিচাঁদ মিত্রের অবদান প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা সাম্মানিক অনার্স bengali honours বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে প্যারিচাঁদ মিত্রের অবদান প্রশ্নোত্তর bangla probondho sahitya parichand mitter obodan questions answer


প্রশ্ন : বাংলা  প্রবন্ধ সাহিত্যে প্যারিচাঁদ মিত্রের অবদান ।


উত্তর:- প্যারিচাঁদ মিত্র ( ১৮১৪ - ১৮৮৩ ) টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে কয়েকটি গদ্য গ্রন্থ রচনা করেন , এবং ওই নামেই পরিচিত হন । সেকালের শিক্ষিত বাঙালী সমাজে প্যারিচাঁদ অগ্রগণ্য এবং মান্য সম্মানীয় ব্যাক্তি ছিলেন । নব্যচিন্তা ও ভাব ভাবনা , স্ত্রীশিক্ষারপ্রসার ও সমাজ সংস্কার নানা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য । কৃষিবিদ্যা ও চর্চা ব্যাবসা বাণিজ্য পরিচালনা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে । এসবের ঊর্ধ্বে বাংলা গদ্য ভাষায় বিবর্তনে তাঁর বিশেষ অবদান সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য , যাঁর প্রভাব আজ পর্যন্ত অনুভূত হয়ে থাকে । বন্ধু রাধানাথ সিকদারের সহায়তায় তিনি “মাসিক পত্রিকা” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন , যাঁর প্রধান লক্ষ্যই ছিল স্ত্রীশিক্ষার প্রসার । লেখা ও কথ ভাষায় একপ্রকার মিশ্রন রীতিই এই “মাসিক পত্রিকা”র প্রধান বিশেষত্ব ছিল । অক্ষয়কুমার , বিদ্যাসাগর এবং তাঁদের ভাবশৈলীর উত্তরাধিকারীদের গুরু গম্ভীর সাধু রীতির ভাষা সহজ বোধগম্য হবে না বুঝতে পেরে , স্ত্রীলোক ও অল্পশিক্ষিত ব্যাক্তিদের বোধগম্য এবং পাঠযোগ্য গদ্যভাষার কথা ভাবতে গিয়ে তিনি কলকাতার কথভাষার ওপর নির্ভর করেন ও তা অবলম্বন করে এই অভিনব গদ্যরীতির উদ্ভাবন ও ব্যাবহারে ব্রতী হন । যদিও এই অভিনব ভাষারীতি তাঁর পূর্বেও অল্পসল্প অবলম্বিত হতে দেখা গেছে , তথাপি আদ্রন্ত এই অভিনব ভাষায় সুষ্ট , সুসামঞ্জস এবং সুগঠিত পদাম্বয় সমন্ধিত রূপ উদ্ভাবন ও প্রয়োগের কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য ।



[        ] প্যারিচাঁদের কয়েকটি গ্রন্থ আখ্যান জাতীয় এবং উপদেশাত্মক , যেমন -  আলালের ঘরের দুলাল , মদ খাওয়া বড় দায় জাত থাকার কি উপায় , রামরঞ্চিকা , অভেদি , আধ্যাত্মিকা , ইত্যাদি । এছাড়া কৃষিতত্ত্ব বিষয়ক ‘ কৃষিপাঠ ’ তাঁর রচনাবলীর অন্তভুক্ত । অবশ্য যে গ্রন্থের জন্য টেকচাঁদ ঠাকুরের বিস্তৃত পরিচিতি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান সেটিই তাঁর প্রথম রচনা “ আলালের ঘরে দুলাল ।” মূলত এই গ্রন্থের ভাষারীতির প্রসঙ্গেই বঙ্কিমচন্দ্র লেখককে সাধুবাদ জানিয়ে তাঁর গদ্যভাষার মূল্যায়ন ও নির্ণয়ে মন্তব্য করেছিলেন “ সংস্কৃত প্রিয়তা ও সংস্কৃতানুকারিতহেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নিরস , দুর্বল এবং বাঙ্গালী সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল । টেকচাঁদ প্রথমেই এই বিষবৃক্ষের মূলে কুঠারঘাত করিলেন । তিনি ইংরেজিতে সুশিক্ষিত , ইংরেজিতে প্রচলিত ভাষার মহিমা দেখিয়াছিলেন এবং বুঝিয়াছিলেন । তিনি ভাবিলেন , বাঙলার প্রচলিত ভাষাতেই  বা কেন গদ্যগ্রন্থ হইবে না । যে ভাষার সকলে কথোপকথন করে , তিনি সেই ভাষায় আলালের ঘরের দুলাল প্রণয়ন করিলেন । সেইদিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি , সেইদিন হইতে শুষ্ক তরুর মূলে জীবনবারি নিষিক্ত হইল । বস্তুত , বঙ্কিমচন্দ্রের কথা সর্বাংশে সত্য , এবং ‘বাঙ্গালার প্রচলিত ভাষা’র যে কি গুরুত্ব তা আমরা এখণও মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে থাকি । প্যারিচাঁদ সুপরিকল্পিতভাবে যে ‘ প্রচলিত রীতি ’ বাংলা গদ্য গ্রহণ করেছিলেন তারই মার্জিত পরিশ্রুত অপেক্ষাকৃত সাহিত্যেগুন ঋগ্ধ গদ্যভাসায় উত্তরকালে বাংলা কথাসাহিত্যের অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে । এদিক থেকে প্যারিচাঁদের ভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য । ইতিপূর্বে “ কথোপকথন ” প্রভৃতি গ্রন্থে লোকের মুখের ভাষা উদাহরণ হিসাবেই মাত্র স্থান হয়েছে , প্যারিচাঁদ সেই ভাষাকে আরও পরিণতি সহকারে সাহিত্যিক ভাষার আসনে সমমর্যাদায় আসীন করেন । তাঁর গদ্য সাধুরিতিটি কিন্তু সম্পূর্ন পরিত্যক্ত হয়নি । সাধুভাষার কাঠামোটি ঠিকই আছে । কথা , শব্দ এবং মাঝে মাঝে বাগভঙ্গির প্রয়োগ করে তিনি তাকে সরল , সহজ এবং বোধগম্য করে তুলেছেন । একটি উদাহরণ 



“ বাবুরামবাবু চৌগোপূপা - নাকে তিলক -কস্তা পেয়ে ধূর্তিপরা - ফুলপুকুরে জুতা পায় - উদর গণেশের মতো - কোঁচান চাদরখানি কাঁধে - একগাল পান - ইতস্তত: বেরাইয়া চাকরকে বলছেন - ওরে হরে ! শ্রীঘ্র বালি যাইতে হইবে , দুই চার পয়সার এক খানি চলতি পানসি ভাড়া কর তো । বড় মানুষের খানসামারা মধ্যে মধ্যে বেয়াদব হয় , হবে বলল , মোসায়ের যেমন কান্ড । ভাত খেতে বস্তেছিনু - ডাকাডাকিতে ভাত ফেলে রেখে এস্তেছি ।..... চলতি পানসি চার পয়সায় ভাড়া করা আমার কর্ম নয় - একি থুতকরি দিয়ে ছাতু গোলা ?”




[       ] আলাল এর ভাষার সর্বোত্তম গুন বৈশিষ্ট্য , “ সাহিত্যিক গদ্য কে জীবনের সান্নিধ্যবর্তী করা আদি আধুনিক আগ্রহ অতি অঙ্কুরিত হতে আরম্ভ করেছিল ।” প্যারিচাঁদ যতদূর সম্ভব সুখের কথাকে বাক্যে প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেছেন । সংস্কৃত শব্দ ও সমাজবদ্ধ পদের আড়ম্বর নেই । তদ্ভব ও দেশী শব্দের ব্যাবহারের দিকে বেশি ঝোঁকেননি । দেশি , তদ্ভব শব্দের পাশাপাশি ধ্বন্যাত্মক শব্দের ব্যাবহারে ভাষাকে গতিময় এবং জীবন্ত করে তুলতে চেষ্টা করেছেন । অভিশ্রুতি , অপিনিহিত ,স্বরসঙ্গতির ব্যাবহারের চেষ্টা না থাকায় বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সাধুরীতির সহজ সুগম গদ্যরীতিটিই তাঁর অবলম্বনীয় মনে হয়েছিল । তবে সাধু সংস্কৃত ভিত্তিক গদ্যভাষা নয় , কথারীতির ভাষাইটিই তিনি পছন্দ করতেন । প্যারিচাঁদ বড় লেখক নন , কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে তাঁর আন্দোলন ও সচেতন ভূমিকা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন