বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২১

সমরেশ বসুর “ আদাব ” গল্পটির মধ্য দিয়ে কোন সময়ের কোন সংকটের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা আলোচনা করো এবং ছোট গল্প হিসেবে এর সার্থকতা নিরূপণ করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours সমরেশ বসুর আদাব গল্পটির মধ্য দিয়ে কোন সময়ের কোন সংকটের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা আলোচনা করো এবং ছোট গল্প হিসেবে এর সার্থকতা নিরূপণ করো প্রশ্নোত্তর

উত্তর:- সমরেশ বসুর একটি অসাধারণ ছোটগল্প “ আদাব ” এদেশের বিশেষ এক সময়েরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কুটিল ও ভয়াবহ ছবি এই গল্পটির মধ্য দিয়ে আভাসিত করার চেষ্টা হয়েছে ।  ইংরেজেদের শাসন কালেই হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিভেদ বৈষম্যকে এমন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল যে হিন্দু মুসলমান পরস্পরকে সহ্য করতে পারত না । কথায় কথায় দাঙ্গা লেগে যেত । আর সেই দাঙ্গার কারণে বলি হত অসহায় , খেটে খাওয়া মানুষেরা । গল্পে তেমনই দুজন মানুষের কথা তুলে ধরা হয়েছে । গল্পের মানুষ দুটির কোনো নাম নেই । তারা হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের দুজন প্রতিনিধি । হিন্দু প্রতিনিধিকে বিশেষিত করা হয়েছে ‘ সুতা মজুত ’ অভিধায় আর মুসলমান প্রতিনিধিকে বিশেষিত করা হয় ‘ মাঝি ’ অভিধায় । এরা দুজনেই নিরীহ , খেতে খাওয়া মানুষ । সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের ভাবনা এদের মধ্যে তিল মাত্র নেই । তবু দাঙ্গার সময় আত্মরক্ষার  জন্য এরা পালিয়ে একই স্থানে আশ্রয় নিয়েছে । একটা ডাস্টবিনের দুদিকে এরা লুকিয়েছে । 

 



[      ] একসময় ডাস্টবিনটি নড়ে উঠতে দেখে দুজনের মনেই ভয় এবং কৌতূহল জেগে ওঠে । এক সময় দু'জন পরস্পর কে দেখে কথা হয় । কিন্তু কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা । পরিচয়ও জানতে সাহস করে না । বিড়ি ধরবার সময় মাঝি অসচেতন ভাবে ‘ সোহান আল্লা ’ কথাটি উচ্চারণ করতেই হিন্দু সুতা মজুর আতঙ্কিত হয়েছে । মাঝির পোঁটলার মধ্যে অস্ত্র পাতি আছে কিনা জানার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠেছে । যখন জেনেছে , পোটলায় বিবি আর পোলাপানদের জন্য কেনা ঈদের পোশাক আছে , তখন আশ্বস্ত হয়েছে । দাঙ্গা হাঙ্গামায় মাঝি কেনা পোশাকগুলো নিয়ে পড়বে বাড়ি যেতে চেয়েও যেতে পারেননি । তার পোলাপানরা নিশ্চয় পথ চেয়ে বসে আছে । একথা শুনে তার প্রতি সুতা মজুরের সহানুভূতি জেগেছে । পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস জন্মেছে । তারা দাঙ্গা হাঙ্গামার অযৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করেছে । মাঝি সুতা মজুর কে বলেছে “ আইস্থা আমারে কইতে পারনি এই মাইর দইর কাটাকাটি কিয়ের লেইগা ?”



 

[       ] সুতা মজুর শহরে থাকে , খবরের কাগজ পড়ে , মাঝির তুলনায় খোঁজও রাখে অনেক । সে জানে মুসলিম লীগের কিছু ভ্রান্তির জন্য এই দাঙ্গা বেঁধেছে । তার মুখে কথাটা শুনে মাঝি বলে “ হেই আমি বুঝিনা । আমি জিগাই , মারামারি কইরা হইব কী ! তোমাগো দুগা লোক মরব , আমাগো দুগা মরব । তাতে দ্যাশের কী উপকারটা হইব ?”




[        ] সাধারণ মানুষ দাঙ্গা হাঙ্গামার সমর্থন কোনো দিনই করে না । বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে তারা সুখ শান্তিতে থাকতে চায় । যারা দাঙ্গা বাঁধায় তার নিজের নিজের নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করে , আর কোনো মানুষের কথা ভাবেনা । মানুষে হয়েও তারা কুকুরের মতো কামড়া কামড়ি করে মরে । এই দাঙ্গার কারণে গরিব মানুষের উপার্জন যে বিঘ্নিত হয় সে কথাও এরা বলেছে । মাঝি মুসলমান বটে তবে তাঁর উপার্জন নির্ভর করে এক হিন্দু নায়েবের অনুগ্রহে । নায়েব পাঁচ টাকা নৌকা ভাড়া তো দেনই , আরো পাঁচ টাকা বকশিসও দেন । দাঙ্গার কারণে ঐ নায়েব যদি মুসলমান নৌকায় না ওঠেন , তাহলে মাঝিরই ক্ষতি হবে ।





[        ] শুধু আর্থিক ক্ষতি হয়  , নিরাপত্তাও  নিরাপত্তাও ঘুচে যাবে গরিব মানুষের । মাঝির পরিবার প্রীতি এ গল্পে ফুটে উঠেছে সার্থকতার সঙ্গে । নতুন পোশাক নিয়ে বাড়ি তাকে যেতেই হবে । ঈদের দিন ছেলেমেয়েরা নতুন পোশাক পরতে পারবে না , এটা সে ভাবতেই পারে না ।  তাই অসময়ে , অস্থানে গড়ে বন্ধুত্ব কে পিছনে ফেলে মাঝি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়েও বাড়ী ফেরার দুঃসাহস করে । কিন্তু বাড়ী ফেরা তাঁর হয়না । টহলদার দের উপস্থিতি উপেক্ষা করে কিছুটা এগিয়ে যেতেই টহলদার তাকে ‘ হল্ট ’ বলে থামাতে চায় । মাঝি না থেমে পালাতে চায় । “ ডাকু ভাগতা হ্যায় ” বলে টহলদার গুলি চালিয়ে দেয় । সুতা মজুর চোখ বুজে অনুমান করতে পারে , মাঝি বলছে “ পারলাম না ভাই । আমার ছাওয়ালরা আর বিবি চোখের পানিতে ভাসব পরবের দিনে ।”




[        ] অসাধারণ মর্মান্তিক পরিণতি দেখানো হয়েছে গল্পটিতে । আর সেটাই যেন দাঙ্গার সময়ের বহু দুঃস্থ পরিবারের করুণ চিত্র । একটা খেতে খাওয়া হতভাগ্য মানুষ অস্ত্রধারী প্রশাসনের কাছে ‘ ডাকু ’ হিসেবে গণ্য হয় । আর গুলি খেয়ে মরে ।  হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কত মানুষ এভাবে মরেছে । ছেলে মেয়েরা তাদের বাবাকে হারিয়েছে ,  বিবি হারিয়েছে তাঁর স্বামী কে মা বাবা হারিয়েছে তাদের ছেলেকে । লেখক সমরেশ বসু তাঁর “ আদাব ” গল্পে মাত্র দুটি চরিত্রের কিছু সংলাপ আর আচরণের মধ্যে দিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় দাঙ্গা পীড়িত সামাজিক মানুষের স্পষ্ট এবং জীবন্ত ছবি অঙ্কন করেছেন , যা যে কোনো পাঠকের হৃদয়ে গভীর ভাবে দাগ কেটে বসে যায় । একটা বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সংকট সম্পর্কে সচেতন হওয়া যায় । গল্পের  রস পরিনতি নিয়ে চরিত্র নিয়ে , সংলাপের ভাষা ব্যাবহার নিয়ে সংশয়ই থাকে না । এই জন্য “ আদাব ” একটি অসাধারণ সার্থক ছোট গল্প হিসেবে গণ্য হবার যোগ্য ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন