সোমবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২১

স্ত্রীর পত্র গল্পটি কোন শ্রেণীর গল্প ? রবীন্দ্রনাথ কীভাবে এ গল্পে তাঁর বক্তব্যকে উপস্থাপিত করেছেন আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours স্ত্রীর পত্র গল্পটি কোন শ্রেণীর গল্প ?  রবীন্দ্রনাথ কীভাবে এ গল্পে তাঁর বক্তব্যকে উপস্থাপিত করেছেন আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর streer potro golpo ti kon srenir golpo robindronath kivabe a golpe tar boktobbo ke uposthapito korechen alochona koro questions answer

উত্তর:-  রবীন্দ্রনাথের পৌঢ বয়সের লেখা একটি বিখ্যাত ছোটগল্প “  স্ত্রীর পত্র ” গল্পটিকে সাধারনত , সামাজিক গল্প হিসেবেই গণ্য করা হয় । তবে , আর একটু স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় “ স্ত্রীরপত্র ” নারী স্বাতন্ত্র্যবাদের গল্প । অভিজাত হিন্দুসমাজে নারীর উপেক্ষিত মর্যাদা ও মানসিক পীড়ন যে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা দেখানো হয়েছে এগল্পে ।




[       ] গল্পের বিষয়বস্তু উপস্থাপিত হয়েছে একটি চিঠির আকারে । গল্পের নায়িকা মৃনাল সংসারের পুরুষ মানুষদের পীড়ন সইতে না পেরে সংসার থেকেই বিদায় নিয়ে তীর্থে চলে গেছে । সেখান থেকেই স্বামীকে চিঠি লিখে মেয়েদের প্রতি তাঁদের আচরণের কঠোর সমালোচনা করেছে । আসলে রবীন্দ্রনাথ মৃণালের চিঠির মধ্য দিয়ে নারীর মর্যাদা ক্ষুন্নকারী নারী অবমাননাকারী নারী , নারী পীড়নকারি পুরুষ সমাজ কে তিরস্কৃত করতে চেয়েছেন । আর সেটা করতে গিয়ে পীড়নের যে সব নমুনা তুলে ধরেছেন , উপস্থাপনার গুনে  তা হয়ে উঠেছে গল্প ছোটগল্পের বিষয় ।




[      ] গল্পের নায়িকা মৃনাল বাড়ীর মেজোবউ । বড় বইয়ের রূপ ছিল না । মেজ বউয়ের রূপ ছিল । সেই রূপের জন্যই অজ পাড়াগাঁর  মেয়ে মৃনালকে কলকাতার অভিজাত বাড়ীর বউ করা হয়েছিল । মৃণালের শুধু রূপই ছিল না বুদ্ধি ও ছিল । কিন্তু সংসার মেয়েদের বুদ্ধির মর্যাদা দেয় না । “ মেয়েমানুষের পক্ষে এ এক বালাই ।” তাই মৃণালের  শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাঁর বুদ্ধিকে সহানুভূতির চোখে দেখেনি । বরং , মেয়ে জ্যাঠা বলে দু’বেলা গাল দিয়েছেন । মৃণালের যে কবিত্ব শক্তি ছিল , সেটাও পরিবারে কেউ জানতে পারেননি ।



[      ] সংসারের নারী যে কত অবহেলা তা দেখাবার জন্য গল্পে আনা হয়েছে বিন্দু চরিত্রটিকে । বাড়ির বড়ো জায়ের বোন বিন্দু ।  তার মা মারা যাওয়ার পর খুড়তুতো ভাইদের  অত্যাচার থেকে বাঁচতে সে দিদির কাছে আশ্রয় নেয় ।  কিন্তু দিদি বা বাড়ির আর কেউ এই অসহায়া মেয়েটির প্রতি সহানুভূতি ছিলেন না  কেবল মৃণাল ছাড়া । বাড়িতে আত্মীয়ার মর্যাদা দূরে থাক , কাজের মেয়ের মর্যাদাটুকুও বিন্দু পায়নি । তার আপন দিদিও তাকে ভালোবাসা দেখায়নি । “ মন খুলে প্রকাশ্য স্নেহ ভালোবাসা  দেখাবেন ,  সে সাহস তাঁর হল না । তিনি পতিব্রতা ।” বিন্দুর প্রতি পরিবারের সকলের দাসী সুলভ আচরনে দুঃখিত এবং লজ্জিত হল । সে বিন্দুকে একটু বেশি করে স্নেহ ভালোবাসা দিতে উদ্যোগী হল । সেটা পরিবারের আর কারো পছন্দ হল না । এমনকি বিন্দুর আপন দিদিরও ।




[       ] এই বিন্দুকে বাড়ি থেকে বিদায় করবার জন্য এক পাগলা পাত্রের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয় । বিন্দু পাগলা স্বামীর কাছ থেকে পালিয়ে এসেছিল । বিন্দু শাশুড়ি জেদ করে তার পাগলা ছেলের সঙ্গে একটা ভালো মেয়ের বিবাহ দিয়েছেন । এটা অন্যায় । এমন স্বামীর সঙ্গে ঘর করা নিরাপদ নয় । মৃণাল এই ফাঁকির বিয়েকে বিয়ে বলে'ই মানতে চাইল না । বলল , “ বিন্দু তুই যেমন ছিলি তেমনি আমার কাছে থাক , দেখি তোকে কে নিয়ে যেতে পারে ।” কিন্তু পরিবারের আর কেউ মেয়েটার কথা ভাবলেন না । এতটুকু মানবিকতাবোধের পরিচয় দিতে চাইলেন না । বরং মৃণালের উদ্যোগকে সমালোচনা করতে সচেষ্ট হলেন ।  সতীলক্ষী স্ত্রী হতে গেলে যে স্বামীর অনেক পীড়ন স্ত্রীকে সইতে হয় , এমন দৃষ্টান্ত তো ভারতে কম নেই ।




[       ] না বিন্দু সতীলক্ষ্মী হয়ে বাঁচতে পারেনি । মৃণাল তাকে বাঁচাবার জন্য ভাই শরৎ কে পাঠিয়ে বিন্দু কে আনিয়ে কোনো তীর্থে পালিয়ে যেতে চেয়েছে ।  কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিন্দু সবুর করতে পারেনি । গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে । সংসারের এই  স্বার্থপর , হৃদয়হীন , সুবিধাবাদী নির্মম মানুষ গুলোর কাছে মাথা নিচু করে আর থাকতে পারেনি । তার প্রতিবাদী সত্তা বিবেচনাহীন সমাজ ব্যবস্থা মেনে নিতে পারেনি । পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে সতীলক্ষী বধু হয়ে জীবন কাটাতে পারেনি । মেজো বউয়ের খোলস গা থেকে খুলে ফেলে বিশ্বসংসারে মৃনাল স্বাধীন হতে চেয়েছে । স্বাধীনভাবে একজন মানুষের মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছে । চিঠির শেষে লিখেছে ” আমিও বাঁচলুম । চিঠি সূচনায় যদিও লিখেছে ‘শ্রীচরণকমলেসু ’  কিন্তু সমাপ্তিতে লিখেছে “ তোমাদের চরণতলাশ্রয়ছিন্ন মৃনাল ।” বোঝা যায় , মৃণালের স্বাধীনতার আকাঙ্খাটাই এখানে প্রবল ।




[     ] এই মৃণালের মধ্য দিয়েই তার প্রতিবাদ ও স্বাধীনতাপিপাসার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নারী স্বাতন্ত্র্য ও নারী মুক্তির কথা ব্যক্ত করেছেন । এই নারী মুক্তির কথা আমরা ‘ হৈমন্তী ’ গল্পে ‘ পলাতকার মুক্তি ’ কবিতায়ও পাই । তবে স্ত্রীরপত্রে তা অনেক বেশি তীব্র । নারী যে পুরুষের সেবাদাসী মাত্র নয় ,  কারো খেলার পুতুল মাত্র নয় , কারো খেয়াল চরিতার্থ করবার জন্যই যে নারীর জন্ম নয় , জগতে নারীরও যে স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার আছে , কর্ম করবার অধিকার আছে , চিন্তা ভাবনা করবার ,  মত প্রকাশের অধিকার আছে এ চিন্তা রবীন্দ্রনাথের মনে অনেক আগেই জন্মেছিল । সেই বিশ্বাসকেই তিনি একজন ব্যক্তিসচেতন , মর্যাদাসম্পন্ন নারী দৃষ্টিকোণ থেকে , কিন্তু উপযুক্ত সামাজিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে অনেক বেশী শিল্প সম্মত এবং বিশ্বাসযোগ্য করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন । এই ভাবে পত্রের মাধ্যমে গল্পের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য পরিবেশনের নতুন আঙ্গিক টি ছোটগল্পের আঙ্গিক হিসেবে অনুপযুক্ত হয় নি ।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন