মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

বাংলা ভাষায় সংস্কৃত মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক কে ? তাঁর কবি প্রতিভার পরিচয় দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের কারণ নির্দেশ করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours বাংলা ভাষায় সংস্কৃত মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক কে ? তাঁর কবি প্রতিভার পরিচয় দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের কারণ নির্দেশ করো প্রশ্নোত্তর

উত্তর:- মধ্যযুগে যাঁর লেখনীতে বাঙালীর জীবনের সার্থক প্রকাশ ঘটেছে তিনি মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক কাশীরাম দাস ।



[        ] মধ্যযুগের বৈষ্ণব সাহিত্যের কথা বাদ দিলে কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসি মহাভারতের মতো অখন্ড ও অক্ষুন্ন গৌরব এবং জনপ্রিয়তা লাভ অন্য কোনও কাব্যের পক্ষে সম্ভব হয়েছে বলে মনে হয় না । তবে এই অষ্টাদশ পর্বের সুগঠিত মহাভারতের কতটুকু তাঁর নিজের রচনা ও কতটুকু তাঁর ভাতুস্পুত্র ও জামাতার সংযোজন এবং কতটুকু অন্য কবির তা নির্ণয় করা সাধ্যের অতীত । তাঁর কাব্যের সমস্ত ইতিবৃত্ত রহস্যবৃত ।


পরিচয় : 

            “ ইন্দ্রানী নামেতে দেশ পূর্বাপর স্থিতি ।

             দ্বাদশ তীর্থেতে কথা বৈসে ভাগীরথী ।।

              দ্বাদশ কুলেতে জন্ম বাস সিঙ্গী গ্রাম ।

               প্রিয়ঙ্কর দাস পুত্র সুধাকর নাম ।।”


কাশীরাম দাস আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন বর্তমানে ইন্দ্রানী পরগনায় সিঙ্গি গ্রামে কায়স্থ পরিবারে জন্ম । পিতার নাম কমলাকান্ত । কবিরা তিনভাই কৃষ্ণরাম , কাশীরাম , গদাধর । ঠাকুরদা সুধাকর এবং তাঁর পিতা প্রিয়ঙ্কর । কবি বংশ ছিল বৈষ্ণব ভাবাপন্ন তাই বৈষ্ণবোচিত বিনয়ে “দেব ” না লিখে দাস লিখেছিলেন । কাশীরাম দাস তাঁর গুরু অভিরাম মুখোটির আশীর্বাদে মহাভারত অনুবাদ করেন । 




রচনাকাল : নানা তথ্য থেকে জানা যায় কবি ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর মহাভারত বোধ হয় সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রচিত হয়ে থাকবে । কাশীরাম দাসের মহাভারত রচনার প্রারম্ভ কাল যেমন অজ্ঞাত তেমনি এর সমাপ্তির পরিচয়ও রহস্যবৃত । কোনও কোনও পুঁথিতে পাওয়া যায় এমন শ্লোক 


         “ আদি সভা বন বিরাটের কতদূর ।

          ইহা রুচি কাশীদাস গেলা স্বর্গপুর ।।”


আবার মহাভারতের ‘ বন ’ পর্বে পাওয়া যায় 


       “ ধন্য হল কায়স্থ কুলেতে কাশী দাস ।

         তিন পর্ব ভারত সে করিল প্রকাশ ।



[      ] এসব থেকে প্রমাণ করা যায় কাশী দাস আদি , সভা , বন ও বিরাট পর্বের কিয়দংশ রচনা করে পরলোক গমন করেন । বাকি গুলো পুত্র , ভ্রাতুস্পূত্র , জামাতা ও অন্যান্য কবিরা যুক্ত করেছেন । 



কবিকৃতি : তিন শতাব্দীর সময়কাল ধরে কাশীরাম দাসের মহাভারত বাঙালী সমাজে আদৃত হয়ে আসছে । বর্নজ্ঞানহীন ব্যাক্তি থেকে শুরু করে কৃতবিদ্য ব্যাক্তি সবাই কাশীরাম দাসের মহাভারতে মুগ্ধ । তাঁর সংস্কৃত জ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলেও রচনা প্রসঙ্গে সেই সংশয়ের মেঘ কেটে গেছে । যেমন ‘ ভিস্ম ’ পর্বে ঘোর সংগ্রামের বর্ণনায় লিপিবদ্ধ করেছেন 


        “ দেখি মহা কোপে ভীষ্ম অন্য ধনু লয় ।

              গগন ছাইয়া বীর বান বরিষায় ।।

           নাহি দেখি দিবাকরে রজনী প্রকাশ ।

           শূন্য পথ রুদ্ধ হইল না চলে বাতাস ।।”


আবার পিতামহের অস্ত গমনের সংবাদ দেন এমনভাবে 


           “ শিয়র করিয়া পূর্বে পড়িল সে বীর ।

            আকাশ হইতে যেন খসিল মিহির ।।”


এছাড়াও দেখা যায় লক্ষ্যভেদি অর্জুনের বীরোচিত রূপের আলংকারিক বর্ণনা 


“ মহাবীর্য যেন সূর্য জলদে আবৃত 

অগ্নি অংশু যেন পাংশু জালে আচ্ছাদিত 

।।”



এইভাবে অনুবাদ কর্মে মহাভারতীয় রস ও ধ্বনি ঝংকার কাশীরাম দাস যথা সাধ্য রক্ষা করেছিলেন । তাঁর রচনা অনেকাংশ মুলাগুণ ও সংস্কৃত নির্ভর । কিন্তু তা কোথাও দুর্বোধ্য ও নীরস হয়ে ওঠেনি । তাঁর বর্ণনার গতি তরল জল  স্রোতের মতো অবাধ সরল । এই সরলতার জন্য একাব্য সর্বজনবোধ ।




[       ] কৃত্তিবাসের সঙ্গে কাশীরাম দাসের মিল যেমন আছে তেমনি পার্থক্য ও আছে । কৃত্তিবাসের কাব্য যেখানে বাঙালী সমাজ সংস্কারের সঙ্গে দেব সমাজের সেতুবন্ধন রচনা করে , সেখানে কাশীরাম দাসের কাব্য যেন মহাভারতের অমৃতবানী বহন করে বাঙালী চিত্তের নীতি , আদর্শ , বিশ্বাসের রাজপথ ধরে অমৃতলোক যাত্রা করে । যেমন - সভাপদে দ্রৌপদী ও হিরিম্বার যে কলহ বর্ণিত হয়েছে তা সপ্তদশ শতাব্দীর বাঙালী সমাজে দুই সতীনের কলহকে হার মানিয়ে দেয় । দ্রৌপদী হিরিম্বাকে গালি দিয়েছেন এই বলে 



         “ কি আহার কি বিচার কোথায় শয়ন ।

         কোথায় থাকিস তোর না জানি কারণ ।।”



হিরিম্বার চুপ না থেকে উত্তর দেয় 


          “ অকারণে পাঞ্চালি করিস অহংকার ।

           পর নিন্দা নাহি দেখ ছিদ্র আপনার ।।”


এইভাবে যখন একে অপরের গালিগালাজে পরিবেশ কে তিক্ত করে তুলেছে তখন 


   “ আপনি উঠিয়া কুন্তী দোঁহে শান্ত করিল ।।”




[        ] সর্বপরি বলতে হয় কাশীরাম ব্যাসের মহাভারতের চার পর্বের ভাবানুবাদ করেছিলেন যাতে পরবর্তীকালে অন্যান্য কবিদের রচনা প্রক্ষিপ্ত হয়েছিল । কিন্তু তাঁর জন্য কাশীরাম দাসের মর্যাদা কোনোভাবে সংকুচিত হয়নি । ছাপাখানার যুগে কাশীরাম দাসের মহাভারত সারা ভারতবর্ষে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল । স্বচ্ছন্দ সরল পয়ারে , ত্রিপদীতে , বৈষ্ণবীয় ভক্তিরসের পটভূমিকায় পুরানাশ্রয়ী সংস্কৃতির আলোকে ব্যাসের মহাভারত কে বাংলায় অনুবাদ করে কাশীরাম দাস অমরত্ব লাভ করেছেন ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন