সোমবার, ১ নভেম্বর, ২০২১

রামায়ণে কৃত্তিবাসের করুন রস আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours রামায়ণে কৃত্তিবাসের করুন রস আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

উত্তর:- রসের দিক থেকে বিচার করলে কৃত্তিবাসের রামায়ণের ফলশ্রুতি হচ্ছে করুন রস , এটিই প্রধান রস । মূল রামায়ণের উত্তরকান্ডেরও প্রধান রস হল এই করুন রস । সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্র মতে রস চারটি - বীর , করুন , আদি ও শান্ত । এই চারটি রসের মধ্যে যে কোনোটি মহাকাব্যের অঙ্গিরস হতে পারে । মূল রামায়ণেও করুন রসের প্রাধান্য । কৃত্তিবাস ও সেই একই রীতি অনুসরণ করেছেন । অযোধ্যা কান্ডের রাম নির্বাসন থেকে আরম্ভ করে উত্তরকান্ডের সীতা নির্বাসন ও সীতার ধরিত্রী মাতার অভ্যন্তরে আশ্রয় গ্রহণ সবত্রই করুন রসেরই প্রাধান্য । দশরথের দেহত্যাগ , রামের নির্বাসনে অযোধ্যাবাসীদের বিলাপ , কৌশল্যার আর্তনাদ সীতা হরণ , সীতা শুন্য কুঠিরে ফিরে রাম লক্ষণের বিলাপ , সীতার অগ্নি প্রবেশ সমস্ত ঘটনার পিছনে আছে করুন রসের প্রবাহ ।



[        ] উত্তরকান্ডে সীতার নির্বাসন , রামের বিষণ্নতা , সীতার পাতাল প্রবেশ এবং চার ভ্রাতার সরযূ সলিলে তনুত্যাগ ইত্যাদি অন্য কোনো মহা কাব্যে এত বেদনার পরিচয় পাওয়া যায় না । পাশ্চাত্য মহাকাব্যের অধিকাংশেই রণদামামা প্রতিধ্বনি । এখানে করুন রসের অবকাশ থাকলেও বীর রস প্রধান রস বলেই গৃহীত হয়েছে । কিন্তু রামায়ণ ধীরে ধীরে বিষন্ন পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে । যদিও কৃত্তিবাসের প্রতিভা বাল্মীকির মতো ভূলোক দ্যুলোক সঞ্চারী নয় , তবু করুন রসে তিনি  যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছেন । মধ্য যুগের বাংলা কাব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে , করুন রসেই বালীর অন্তর সমাধিক সাড়া দিয়েছে । কৃত্তিবাসও তাঁর উপর ভিত্তি নিবেদন করেছে । রামচন্দ্রের দুঃখহত পরিমাণ কে দৈবীলীলা মনে করে আশ্বস্ত হয়েছে , কিন্তু সমস্ত কিছুই চলেছে বাঙালীর সুখ দুঃখে গড়া জীবনকে অবলম্বন করে । সীতার মধ্যে বাঙালী নারী সমাজের সুখ দুঃখই যেন উপলদ্ধি করতে চেয়েছে । সীতা চরিত্র বাঙালীর কাছে শুধু একটি প্রাচীন পৌরাণিক নারী চরিত্র নয় , তাঁর মধ্য দিয়ে বাঙালী সর্বংসহ স্ত্রীসমাজকেই প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছে ।



[       ] কৃত্তিবাস রামায়ণের আদি কান্ড দৃষ্ট হয় রাক্ষস বধের জন্য ঋষি বিশ্বামিত্র রাম লক্ষণ কে নিয়ে যাচ্ছেন । বিদায় মুহূর্তে দশরথের আকুল ক্রন্দন কাব্য করুন রস সৃষ্টিতে বিশেষ সহায়ক হয়েছে 


            কত দূরে গিয়া রাম হন অদর্শন ।

           ভূমিতে পড়িয়া বাছা করেন ক্রন্দন ।।


তবে পিতার মতোই রাম লক্ষনও থেমে থাকেননি । তারাও 


          রাজার দুঃখেতে দুঃখী শ্রীরাম লক্ষণ ।

          রাজার ক্রন্দনে কাঁদেন ভাই দুইজন ।।



এরপর রামের বনবাসে অযোধ্যা যখন ক্রন্দনের রোলে মুখরিত ঠিক সেই সময় অরণ্য মাঝে অকস্মাৎ রাবণ কতৃক সীতা অপহৃত হওয়ার রামের যে বিলাপ তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে 



           কান্দিয়া বিফল রাম জলে ভাসে আঁখি 

           রামের ক্রন্দনে কান্দে বন্য পশু পাখি । 


সীতাকে হারিয়ে রামচন্দ্র মাল্যবান পর্বতে উপনীত হলে , সেখানে রামের বিলাপে আকাশ বাতাস মুখরিত হতে থাকল । বর্ষার অঝোর ধারাও জানিয়ে দিল রামচন্দ্র দুঃখিত । কারণ ‘ সীতা লাগি শ্রীরামচন্দ্র হয়ে উঠেছেন বাঙালী পুরুষ । কাজেই অতি সহজ তাঁর চরিত্র হতে বীরোচিত ধৈয্য , গাম্ভীর্যের চিত্র বিদূরিত হয়েছে । সীতার জন্য রামের যে আচরণ দৃষ্ট হয় তা কাপুরুষচিত হলেও অতি বাস্তব । কারণ স্ত্রীকে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করতে দেখে রামচন্দ্র পাগল হন ।


         “ দেখেন সংসার শূন্য যেমন পাগল ।

          ভূমে গড়াগড়ি যায় হইয়া বিকল ।।”



শুধু রাম কেন , রামের সঙ্গে উপস্থিত সভাসদ সবাই কাঁদছেন । আর “ রামের ক্রন্দনে কাঁদে সর্ব দেবগণ ।” অর্থাৎ সমগ্র রামায়ণ জুড়ে সীতার বিহনে রামের মর্মক্রন্দন প্রতিধ্বনিত হয়েছে । সীতা অপহরণ থেকে শুরু করে , অগ্নি পরীক্ষা , এমনকি পাতাল প্রবেশ পর্যন্ত রামের অশ্রু বিনিগত হয়েছে । প্রশ্ন জাগে শুধু অশ্রু দিয়ে কি এই বিশাল মহাকাব্যে সৃষ্টি করা হয়েছে , সীতা বিসর্জনের দ্বাদশ বর্ষ পর মহাকবি ভবভুতি রামের মনের অবস্থা কে ব্যক্ত করতে লিখেছেন “ স্পটিপাক প্রতিকাশোরামস্য করুনো রস: ।” অর্থাৎ ছিদ্রহিন লৌহপাত্রে জল উত্তপ্ত হলে তার বাষ্প যেমন বাইরে আসতে পারে না , অনুরূপ , রামের মর্মস্থলও অবরুদ্ধ “ সন্তাপে দগ্ধ হচ্ছে । রামের এই অন্তহীন দাহ ও বিষাদের ক্ষেত্রে কৃত্তিবাসের রামের কোনও তুলনা আছে কি ?




[        ] পরিশেষে বলতে হয় , কাব্যমধ্যে কৃত্তিবাস অল্পসল্প বীররসের পরিচয় দিলেও তা স্বত:স্ফুত হয়নি । অভিজ্ঞতার অভাবে কৃত্তিবাসের রাম রাবণের যুদ্ধ বর্ণনা যাত্রা দলের লম্ফ ঝম্পে পরিণত হয়েছে । সবচেয়ে মারাত্বক হয়েছে বীররসের সঙ্গে ভক্তির অনধিকার প্রবেশ । রাবণ , বিরবাহু তরণী সেন সকলেই ভক্ত , কেউ প্রকাশ্য কেউ বা প্রচ্ছন্নভাবে । সুতরাং তাদের মৃত্যুতে বীররসের গাম্ভীর্যের হানি হয়েছে । মধ্যযুগের কোনও রচনাতেই যুদ্ধ বিগ্রহের বর্ননা যথেষ্ট বাস্তবধর্মী হতে পেরেছে । কিন্তু পুরাতন বাংলা কাব্যের যুদ্ধবর্ণনা অত্যন্ত কৃত্রিম । কৃত্তিবাসও তাঁর বাইরে যেতে পারেননি । কাজেই সব মিলিয়ে বলতে হয় , কৃত্তিবাসী রামায়ণে বহু দুঃখজনক ঘটনা এবং তাঁর জন্য হাহাকার যেমন করুন রস সৃষ্টি করেছেন তেমনি বিরাট যুদ্ধ বর্ণনা চিত্র প্রকটিত হলেও সার্থক ভাবে বীররসের সৃষ্টি হয়নি ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন