শনিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২১

মালাধর বসুর জীবনী সংক্ষেপে বিবৃত করে তাঁর অনূদিত “ শ্রীকৃষ্ণ বিজয় ” এ কবির কৃতিত্ব পর্যালোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours মালাধর বসুর জীবনী সংক্ষেপে বিবৃত করে তাঁর অনূদিত “ শ্রীকৃষ্ণ বিজয় ” এ কবির কৃতিত্ব পর্যালোচনা করো প্রশ্নোত্তর

উত্তর:- গৌরেশ্বরের পৃষ্টপোষকতায় মলাধর বসু “ শ্রীকৃষ্ণ বিজয়  ” কাব্যটি রচনা করেছিলেন । 


         “ গুন নাই , অধম মুই , নাহি কোনজ্ঞান ।

              গৌরেশ্বর দিল নাম গুনরাজখান ।।”



কিন্তু এই গৌরেশ্বরের প্রসঙ্গে মালাধর বসু নীরব থাকলেও পন্ডিতরা গ্রন্থ রচনাকাল ধরে অনুমান করেন রুকুনুদ্দিন বড়বক শাহই গৌড়েশ্বর । তিনি কবিকে উপাধি দিয়েছিলেন “ গুনরাজ খান ”। 


আবির্ভাব কাল : প্রাচীণ বাংলা সাহিত্যর অন্যান্য কবিদের মত মালাধর বসুর আবির্ভাব কালও কুয়াশায় আবৃত । তাঁর রচিত ‘ শ্রীকৃষ্ণবিজয় ’ বাংলা সাহিত্যের সাল তারিখ যুক্ত প্রাচীনতম গ্রন্থ । তাতে কবির আবির্ভাব কাল সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই । তবে গ্রন্থে পরিবেশিত বিভিন্ন তথ্য থেকে অনুমান করা যায় , তিনি সম্ভবত পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই আবির্ভুত হয়েছিলেন এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব কালেও জীবিত ছিলেন । 



জন্ম ও বংশ পরিচয় : তিনি বর্ধমান জেলার কুলীন গ্রামে কায়স্থ বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । ধর্ম সাধনের ক্ষেত্রে এই গ্রামের প্রসিদ্ধির কথা সর্বজনবিদিত । এই গ্রাম বৈষ্ণব সাধনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল । তাঁর পিতা ভাগীরথ , মাতা ইন্দুমতী । তাঁর এক পুত্র সত্যরাজখান ছিলেন শ্রীচৈতন্যের অন্যতম পার্ষদ ।


রচনাকাল : 

                 “ তেরশ পঁচানই শকে গ্রন্থ আরম্ভন ।

                     চতুর্দশ দুই শকে হৈল সমাপন ।।”


অর্থাৎ মালাধর বসু ১৪৭৩ খ্রি: তাঁর “ শ্রীকৃষ্ণবিজয় ” গ্রন্তের রচনাকাল শুরু করেন এবং ১৪৮০ খ্রি: সমাপ্ত করেন ।



শ্রীকৃষ্ণবিজয় নামকরণ : মালাধর বসু বাংলায় ভাগবত অনুবাদের প্রথম পথিক । সংস্কৃতের জটা বন্ধন থেকে তিনিই প্রথম ভাগবতীয় কাহিনীকে বাংলায় মুক্তি দেন । তাঁর অনূদিত ভাগবত কাহিনী “ শ্রীকৃষ্ণবিজয় ” নামে পরিচিত । “ শ্রীকৃষ্ণবিজয় ” , “ গোবিন্দ বিজয় ” এবং “ গোবিন্দ মঙ্গল ” নামেও তাঁর কাব্য খ্যাত । কোথাও কোথাও তা “ শ্রীকৃষ্ণবিক্রম ”  নামেও চিহ্নিত । শ্রীকৃষ্ণবিজয় মূল ভাগবত পুরানের ধারানুসারী । নামকরণের “ বিজয় ” কথাটি অর্থ মৃত্যুকে দ্যোতিত করে । কিন্তু এ খানে কৃষ্ণের মৃত্যুর কথা নেই আছে তাঁর অসুরঘাতী শত্রু দমনের ও ঐশ্বযের রূপায়ণ । তবে “ মঙ্গল ” কথাটির উপস্থিতিতে বোঝা যায় কৃষ্ণ জীবন কথা নিয়ে হয়ত তিনি কোন পাঁচালি রচনা করতে চেয়েছেন ।


কাহিনী : এই কাব্যে খুব নিষ্ঠার সঙ্গে কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলা , মথুরা লীলা ও দ্বারকালীলা বর্ণিত হয়েছে । বৃন্দাবন লীলায় রয়েছে ভুভার হরণের জন্য বিষ্ণুর বৃন্দাবনে কৃষ্ণ রূপে জন্ম গ্রহণ থেকে মথুরা যাত্রা , মথুরা লীলায় রয়েছে কংসের নিধন । দ্বারকায় দ্বারকাপুরী নির্মাণ থেকে কৃষ্ণের তনুত্যাগ পর্যন্ত কাহিনীর ধারাবাহিক বর্ণনা । মালাধর বসু কৃষ্ণের গোপী প্রসঙ্গ ও রাসলীলা বিষয় গুলিকে সংক্ষিপ্ত করে কৃষ্ণের বলবীর্যের কাহিনী বিবৃত করেছেন ।



কবিত্ব : মালাধর বসুর “ শ্রীকৃষ্ণবিজয় ” কাব্যে কবিত্ব ও শিল্প চাতুর্যের থেকে অনুবাদকের পরিচয় পরিস্ফুট হয়েছিল । কবিত্বময় বর্ণনা কিংবা শিল্পচাতুর্যময় প্রকাশ অত্যন্ত দুর্লভ , সহজ , সরল , নিরলঙ্কিত ভাষায় কৃষ্ণের ঐশী শক্তির বর্ণনা কিংবা ছিল তাঁর মুখ্য পরিকল্পনায় ।


ভক্তিরস : ভক্তিরস তেমনভাবে এ খানে পরিস্ফুট হয়নি । মূলত কৃষ্ণের ঈশ্বর সত্তার শক্তি প্রাচুর্যের বিজয় গাঁথা রচনা করেছেন । এর মধ্যে দিয়ে তাঁর সমকালীন যুগ বাসনার চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে । 


ভাষা : শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের ভাষা সহজ , সরল নিরলংকৃত । আসলে যুগ ধর্মের চাহিদা পূরণের জন্য মালাধর কৃষ্ণের সহজ সরল জীবনকাব্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন । ফলে তাঁর কাব্য অচিরেই কৃষ্ণলীলা প্রচারের ক্ষেত্রে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ।




[       ] সর্বপরী বলতে হয় , মালাধর বসু বিরচিত ও শ্রীচৈতন্য প্রশংসিত “ শ্রীকৃষ্ণবিজয় ” কাব্যে বাংলাদেশের জন জীবনে কৃষ্ণ কাহিনী প্রচারের প্রথম ও প্রধান কাব্য গ্রন্থ । মালাধরের কৃষ্ণ নিষ্ঠা এবং তাঁর কাব্যের রস পরিণাম বাঙালীর অন্তলোকে যে কৃষ্ণভক্তির ঐশ্বর্য সঞ্চারিত করেছিল , পরেরকালে সেই ঐশ্বর্য দিয়ে “ বাঙালীর হিয়া অমিয় মথিয়া ” নিমাই কায়া পরিগ্রহ করেন ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন