শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১

বিভূতিভূষণের “ পুঁইমাচা ” গল্পটি ছোটগল্প হিসেবে কতটা সার্থক হতে পেরেছে আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর

 

বাংলা অনার্স সাম্মানিক bengali honours বিভূতিভূষণের পুঁইমাচা গল্পটি ছোটগল্প হিসেবে কতটা সার্থক হতে পেরেছে আলোচনা করো প্রশ্নোত্তর bibhutibhushan puimancha golpoti choto golpo hisebe kotota sarthok hote pereche alochona koro

উত্তর:- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা বিখ্যাত গল্প “ পুঁইমাচা ” । অর্থাভাব আর স্নেহ ভালোবাসার অভাবে নিষ্পাপ জীবনে কিভাবে শেষ হয়ে যায় , তারই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এ গল্পে । সহায়হরি চাটুজ্জে গরি ব্রাহ্মণ । চেয়ে চিন্তে ,  উচ্চবিত্ত করে কোন রকমে তার দিন কাটে । তাঁর তিন কন্যা বড়োটির বয়স প্রায় পনেরো । তখনকার সামাজিক রীতি অনুসারে বিয়ে না দিলেই নয় । কিন্তু দরিদ্র সহায়হরির পক্ষে পাত্র জোগার করা সহজসাধ্য ছিল না । একটা পাত্র জুটিয়ে  দিয়েছিল প্রতিবেশী কালিময় ঠাকুর । কিন্তু বিয়ের আগেই সে পাত্রের মন্দ স্বভাবের পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ায় সহায়হরি মেয়ের আশির্বাদ হয়ে যাওয়ার পরও বিয়ে ভেঙে দেন । লোকনিন্দা , একঘরে হবার সম্ভাবনা সত্বেও সহায়হরি জেনেশুনে মেয়েকে মন্দ লোকের হাতে তুলে দিতে পারেননি ।



[       ] বড় মেয়ে ক্ষেন্তিকে  খুব ভালবাসতেন সহায়হরি ।  তার স্ত্রী অন্নপূর্ণা ভালবাসতেন মেয়েদের । কিন্তু দারিদ্র তাদের ভালোবাসাকে মাথা তুলতে দেয়নি । অন্নপূর্ণা মেয়ের বিয়ে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন । বিবাহের বয়স পার হওয়া মেয়েকে নিয়ে পাঁচজনের পাঁচ কথা বলুক , এটা চান না বলেই অন্নপূর্ণা বকাঝকা করে ক্ষেন্তি কে ঘরে আটকে রাখতে চান , দৈন্য দশার জন্য   মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি । সাধারণ ঘরের ছেলে মেয়েদের মতোই তারা সারাদিন টো টো করে বেড়ায় । খাওয়ার জিনিস পেলে সংগ্রহ করে আনে ।




[      ] সহায়হরির বড়ো মেয়ে ক্ষেন্তির খাওয়ার লোভটা বেশী । সে পুঁইশাক , পুঁইডাটা চচ্চড়ি খুব ভালোবাসে । বাড়ীর কোণের দিকে অসময়ে একটা পুঁইচারা পুঁতে দুবেলা জল ঢেলে বাঁচিয়েছে । উৎসবে , পার্বণে ভালো কিছু খাবার তৈরী হলেও ক্ষেন্তি খুব খুশি হত । খাবার তৈরী তে মাকে সাহায্য করবার আগ্রহও তার ছিল । খাবার লোভে আর ঘুরে বেড়াবার লোভ ছাড়া ক্ষেন্তির আর কোনো দোষ ছিল না । অত্যন্ত সহজ সরল ও শান্ত প্রকৃতির মেয়ে এই ক্ষেন্তি । পৌষ পার্বণে পিঠে তৈরী হলে তিনি মেয়েকে এক সঙ্গে গরম গরম পিঠে দিয়েছেন অন্নপূর্ণা । ক্ষেন্তি উনিশ খানা পিঠে খাওয়ার পরও অন্নপূর্ণা আরো দেবে কিনা জানতে চাইলে সে “ না ” বলেনি । অন্নপূর্ণা তাঁর এই শান্ত , নিরীহ , একটু অধিক মাত্রায় ভোজনপটুমেয়েটির খাওয়া দেখতে দেখতে ভাবলেন “ ক্ষেন্তি আমার যার ঘরে যাবে , তাদের অনেক সুখ দেবে । এমন ভালোমানুষ , কাজ কর্মে বকো , মারো , গাল দাও , টু শব্দটি মুখে নেই , উঁচু কথা কখনো শোনে নি .....”



[      ] এমন মেয়ের বিয়ে হল ।  দ্বিতীয় পক্ষের বছর চল্লিশের পাত্রের সঙ্গে ক্ষেন্তির বিয়ে হল । কিন্তু শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলোকে সুখ দিতে পারলো কই ? বিয়ের চৌদ্দ পনেরো মাস পরে বিস্নু সরকারের সঙ্গে সহায়হরির কথোপকথন থেকে আমরা জানলাম ক্ষেন্তি আর ইহ জগতে নেই । সম্পন্ন ঘরে বিয়ে হলেও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ছিল চামার । পনেরো আড়াইশো টাকা বাকি ছিল । সে টাকা না পেলে তারা মেয়েকে বাপের বাড়িতে পাঠাবে না বলেছে । মেয়েটাকে ভালবাসেনি শুধু কষ্ট দিয়েছে । মেয়ের নামে নিন্দা প্রচার করেছে । “ ছোট লোকের মেয়ের মতোন চাল , হাভাতে ঘরের মতো খাই খাই ... আরো কত কি ।” গায়ে বসন্তের চিহ্ন দেখা দেওয়া মাত্র সহায়হরির শুরু সম্পর্কের বোনের বাড়িতে ফেলে এসেছে । বাপের বাড়িতে খবর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি । টালায় সেই দূর সম্পর্কের পিসির বাড়িতেই ক্ষেন্তি মারা যায় । একটা জীবন কত অবহেলায় , কত অসম্পূর্ণ অবস্থায় শেষ হয়ে যায় ।




[      ] দারিদ্র , অশিক্ষিত , অনুদারতা , অমানবিক সামাজিক প্রথা এই সবই সুস্থ জীবনের প্রতিবন্ধকতা । অর্থলোভ মানুষকে অমানুষ করে তোলে । স্বার্থপর করে তুলে । তাই নববধূর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে তাদের বাঁধে না । ক্ষেন্তির মতো মেয়ে বিনা চিকিৎসায় , অনাদরে মারা গেলও প্রতিবাদ হয় না । প্রতিবাদ করবার মতো অর্থবল , মনোবল , জনবল কিছুই তো সহায়হরির কাছে নেই । তিনি কিসের জোরে মেয়ের অকাল মৃত্যুর জন্য কৈফিয়ৎ চাইবেন । দরিদ্রকে কে সমর্থন করে পাশে দাঁড়াবে । অসহায় সহায়হরিরা হরির উপরেই সব বিচারের ভার দিয়ে কেবল মৃত কন্যার স্মৃতি নিয়ে শান্ত ভাবে বেঁচে থাকবেন ।





[      ] লেখক অসাধারণ বর্ণনার গুনে তুচ্ছ বিষয়কেও গল্পের বিষয়ে পরিণত করে তুলেছেন ।  বিংশ শতকের গোড়ার দিকের গ্রাম্য প্রেক্ষাপটে তিনটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন । অশিক্ষা , সংস্কার , সামাজিক প্রথার দারিদ্র্যের ফলশ্রুতি যে সাধারনের কাছে কেমন  ভয়ঙ্কর , তা তুলে ধরা হয়েছে এই গল্পে । চরিত্রগুলিও বাস্তবসম্মত ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে । সব দিক বিচার করে ‘ পুঁইমাচা ’ কে অবশ্যই একটি সার্থক ছোটগল্প বলতে হবে ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন